বান্দরবানের নতুন সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টকে (কেএনএফ) তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন রোয়াংছড়ির বম সম্প্রদায়ের মানুষ ও এলাকার বাসিন্দারা। সোমবার (১০ জুন) সকাল সাড়ে ৯টায় কেএনএফের ব্যাংক ডাকাতি, অস্ত্র লুট, অপহরণ ও চাঁদাবাজির প্রতিবাদে সমাবেশ এবং মানববন্ধন করা হয়। সর্বস্তরের জনসাধারণের ব্যানারে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
রোয়াংছড়ি বাজার এলাকায় সকাল আটটা থেকে লোকজন জড়ো হতে থাকেন। বিশেষ করে বম জনগোষ্ঠীর নারী-পুরুষকে বেশি দেখা গেছে। সেখানে তাঁরা প্রতিবাদ সমাবেশ ও মানববন্ধনের আয়োজন করেন। মানববন্ধনের শুরুতে লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন জেনেট বম। আরও বক্তব্য দেন পাইক্ষ্যং মৌজার হেডম্যান (মৌজাপ্রধান) বৈইথান বম, খ্রিষ্টান পাদরি পারখুপ বম ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নেইটন বুইতিং বম।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি নেইটন বুইতিং বম কেএনএফকে একটি অবৈধ সশস্ত্র সংগঠন উল্লেখ করে বলেন, সারা দেশে শান্তিপূর্ণ ও সম্প্রীতির জেলা হিসেবে পরিচিত বান্দরবান এখন আতঙ্কের নাম হয়েছে। একমাত্র কেএনএফের হত্যা, অপহরণ, ব্যাংক ও অস্ত্র লুটের কারণে এটি হয়েছে। তাদের অপকর্মের কারণে রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায় শত শত পরিবার, বিশেষ করে বম জনগোষ্ঠীর মানুষ খেয়ে না খেয়ে জঙ্গলে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি কেএনএফকে সন্ত্রাসী তৎপরতা পরিহার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লুট করা ১৪টি অস্ত্র ফিরিয়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার আহ্বান জানান। অন্যথায় তাদের প্রতিহত করা হবে বলে হুঁশিয়ার করেন।
বান্দরবান সরকারি কলেজের ছাত্রী জেনেট বম বলেন, কেএনএফে’র ক্রমবর্ধমান বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। কেএনএফের অনৈতিক কার্যকলাপের জন্য সাধারণ বম জনগোষ্ঠীর মা-বোন, বৃদ্ধ ও শিক্ষার্থীরা ভুক্তভোগী হতে চাই না। আজ বম জনগোষ্ঠী অধিকাংশ গ্রাম জনশূন্য। শতশত মানুষ দেশান্তরিত হচ্ছে। স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির শিক্ষার্থীদের পড়াশুনা বন্ধ হচ্ছে। স্বাভাবিক গৃহস্থালি কাজ, আর্থ-সামাজিক, জীবন-জীবিকা ব্যাহত হচ্ছে। এলাকায় সাধারণ মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে মানবেতর জীবনযাপন করছে। এসবের দায়ভার কেএনএফ’কে নিতে হবে। বম জনগোষ্ঠীর প্রধান আয়ের উৎস হচ্ছে ফলজ বাগান ও জুম চাষ। ফলজ বাগান করে শতশত পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। ফল-মূল বিক্রি করার এই মৌসুমে কেএনএফ’র সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এলাকায় অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে ব্যবসায়ীরা বম পাড়ায় আসতে পারছেন না। শত একর ফলজ বাগান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কেএনএফ সংগঠনের প্রতি আমাদের অনুরোধ, যদি সমাজে শান্তি চাও, লুণ্ঠিত সরকারি অস্ত্র ফেরত দিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসো। তোমাদের অযৌক্তিক ও অবান্তর দাবি বম জাতির সামাজিক অবক্ষয়, বিশৃঙ্খলা, অর্থনৈতিক ধ্বংস ও এলাকার ক্ষতি ছাড়া কোনো সুফল বয়ে আনবে না।
লিখিত বক্তব্যে কেএনএফের প্রতি তিনটি বার্তা দেওয়া হয়। সেগুলো হলো ব্যাংক ডাকাতির সময় পুলিশ ও আনসার বাহিনীর লুট করা ১৪টি অস্ত্র ও গুলি ফিরিয়ে দেওয়া, অবৈধ সশস্ত্র কর্মকাণ্ড বন্ধ এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা।
নতুন সশস্ত্র সংগঠন কেএনএফ শান্তি প্রতিষ্ঠা কমিটির সঙ্গে শান্তি আলোচনা চলাকালে গত ২ ও ৩ এপ্রিল রুমা ও থানচিতে ব্যাংক ডাকাতি, পুলিশ-আনসার বাহিনীর ১৪টি অস্ত্র, ৪১৫টি গুলি লুটের ঘটনা ঘটেছে। এরপর থেকে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ ও আনসার বাহিনী কেএনএফ সদস্যদের গ্রেপ্তার, লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারের জন্য সমন্বিত অভিযান পরিচালনা করছে। অভিযানে এ পর্যন্ত কয়েকজন কেএনএফ সদস্য নিহত হয়েছেন। ব্যাংক ডাকাতি ও অস্ত্র লুটের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৯২ জনকে।

-পার্বত্য সময়