চীন থেকে সৌর সরঞ্জাম আমদানি কমিয়ে 'আত্মনির্ভর ভারত' গড়ার লক্ষ্যে কেন্দ্র সরকারের গৃহীত নতুন নীতি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। চলতি বছরের ১ জুন থেকে ভারতীয় প্রকল্পগুলোতে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সোলার সেল (সৌর কোষ) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে নরেন্দ্র মোদি সরকার। তবে বাস্তব পরিকাঠামো তৈরির আগেই আমদানি নিয়ন্ত্রণের এই সিদ্ধান্তের ফলে কাঁচামালের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে এবং দেশজুড়ে বহু সৌর প্যানেল কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের এই শিল্পনীতির প্রধান সমস্যা ছিল এর ক্রমানুসারে ভুল সিদ্ধান্ত। দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা পর্যাপ্ত পরিমাণে না বাড়িয়েই দ্রুত চীন থেকে আমদানি বন্ধের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।

'অল ইন্ডিয়া সোলার মডিউল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন'-এর তথ্য অনুযায়ী, নীতি চালুর মাত্র দুই মাসের মাথায় দেশের প্রায় ১৪০টি সৌর প্যানেল প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তাদের উৎপাদন স্থগিত রাখতে বাধ্য হয়েছে। সোলার সেলের অভাবে সচল থাকা কারখানাগুলোও সপ্তাহে মাত্র ৩ থেকে ৪ দিন কাজ চালাচ্ছে।

ভারত সৌর প্যানেল বা মডিউল অ্যাসেম্বলি করার ক্ষেত্রে প্রায় ১৯৩ গিগাওয়াট পর্যন্ত সক্ষমতা অর্জন করেছে। তবে এই প্যানেলের মূল কাঁচামাল-'সৌর কোষ' বা 'সোলার সেল' তৈরির ক্ষেত্রে ভারতের সক্ষমতা মাত্র ৩১ গিগাওয়াট। এতদিন দেশের মোট প্রয়োজনীয় সোলার সেলের প্রায় ৯৫ শতাংশই চীন থেকে আমদানি করা হতো।  দেশীয় কারখানাগুলো থেকে পর্যাপ্ত সোলার সেল পেতে প্রায় ৬ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। ফলে বিপাকে পড়েছেন মাঝারি ও ছোট শিল্প উদ্যোক্তারা।

ভারতের সৌর সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী শিল্পে প্রায় ৭৫ হাজার শ্রমিক কর্মরত, যার একটি বড় অংশ- প্রায় ৪৫ হাজার শ্রমিক প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নিজ রাজ্য গুজরাটে। কাঁচামাল সংকটে কারখানাগুলো দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ থাকলে ব্যাপক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চীনা আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ভারতের জন্য অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির কারণ বলে দেখানো হয়। বিগত অর্থবছরেই ভারত প্রায় ১.৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের সোলার সেল আমদানি করে, যার সিংহভাগ উৎস ছিল চীন।

নয়াদিল্লির মূল উদ্দেশ্য ছিল কৌশলগত নিরাপত্তা জোরদার করা এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানো। তবে শিল্প মালিকদের মতে, একটি মানসম্মত ও প্রতিযোগিতামূলক সোলার সেল তৈরির পরিকাঠামো গড়তে বিপুল মূলধন, আধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশেষ সরঞ্জামের প্রয়োজন, যা রাতারাতি তৈরি সম্ভব নয়।

ভারতের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট অ-জীবাশ্ম বিদ্যুৎ উৎপাদন করা, যার মধ্যে প্রায় ৩০০ গিগাওয়াট আসার কথা সৌরশক্তি থেকে। দেশীয় শিল্পে এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তরের জাতীয় সময়সীমা পিছিয়ে যেতে পারে।

যদিও কেন্দ্রীয় নবায়নযোগ্য শক্তি মন্ত্রণালয় কারখানা বন্ধের দাবিগুলো খারিজ করে জানিয়েছে যে, অভ্যন্তরীণ সোলার সেল উৎপাদন দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে এই ব্যবধান কমে আসবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মনির্ভরশীল হওয়া একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও, অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও পরিকাঠামো প্রস্তুত না করে তড়িঘড়ি চীনা আমদানি বন্ধের সিদ্ধান্ত ভারতের সবুজ শক্তি প্রকল্পের গতিকে সাময়িকভাবে ব্যাহত করেছে।