মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে সীমিত পরিসরে ভূখণ্ড বিনিময়ের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে ভারত। মণিপুর সীমান্তের একটি অমীমাংসিত অংশ চিহ্নিত করতে এ ধরনের প্রস্তাব নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে বলে জানিয়েছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে, মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) নয়াদিল্লিতে এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের কিছু অংশ এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি এবং সেগুলো নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

মণিপুর সীমান্তে সম্ভাব্য ভূখণ্ড বিনিময়ের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “সীমান্তের কিছু অংশ এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। ওই অংশগুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।” তবে তিনি এ ধরনের কোনও প্রস্তাবের বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি।

এর আগে গত ১৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাময়িকী দ্য ডিপ্লোম্যাট এক প্রতিবেদনে জানায়, মণিপুর-মিয়ানমার সীমান্তের ৬৫ ও ৬৮ নম্বর সীমান্তস্তম্ভের মধ্যবর্তী অংশ চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করতে প্রায় ১ দশমিক ৪ বর্গমাইল এলাকা বিনিময়ের একটি প্রস্তাব সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে ভারত সরকার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত এলাকা মণিপুরের চান্দেল জেলার সঙ্গে মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চলের কাবাও উপত্যকার সংযোগস্থলে অবস্থিত। ২৬ মে তারিখের একটি সরকারি নথির বরাত দিয়ে সেখানে বলা হয়, সীমান্ত নির্ধারণের কাজ তিন মাসের মধ্যে, অর্থাৎ চলতি আগস্টের মধ্যেই শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও মিজোরাম হয়ে এ সীমান্ত মিয়ানমারের সাগাইং অঞ্চল ও চিন রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চলঘেরা এই সীমান্তের দুই পাশেই দীর্ঘদিন ধরে একই জাতিগোষ্ঠীর মানুষের বসবাস।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্তের প্রায় ১ হাজার ৪৭২ কিলোমিটার অংশ সীমান্তস্তম্ভের মাধ্যমে চিহ্নিত হলেও প্রায় ১৭১ কিলোমিটার এখনও অমীমাংসিত। এর বড় অংশই অরুণাচল প্রদেশের লোহিত এলাকা এবং মণিপুরের কাবাও উপত্যকায় অবস্থিত।

কেন বিবেচনায় ভূখণ্ড বিনিময়?

দ্য ডিপ্লোম্যাট বলছে, সীমান্ত দ্রুত চিহ্নিত করে পুরো ভারত-মিয়ানমার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিতেই এ ধরনের প্রস্তাব বিবেচনা করছে ভারত। এর মাধ্যমে অবৈধ অনুপ্রবেশ, সীমান্তপারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর চলাচল এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনার লক্ষ্য রয়েছে নয়াদিল্লির।

২০২৪ সালে ভারত সরকার পুরো ১ হাজার ৬৪৩ কিলোমিটার সীমান্তে বেড়া নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। একই সঙ্গে ২০১৮ সাল থেকে চালু থাকা ফ্রি মুভমেন্ট রেজিম (এফএমআর) বাতিলের সিদ্ধান্তও নেয়। এ ব্যবস্থার আওতায় সীমান্তবর্তী উপজাতীয় জনগোষ্ঠী সীমান্ত পাস ব্যবহার করে ভিসা ছাড়াই একে অপরের ভূখণ্ডে সর্বোচ্চ ১৬ কিলোমিটার পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারত।

বর্তমান ভারত-মিয়ানমার সীমান্ত ১৯৬৭ সালের দ্বিপক্ষীয় চুক্তির ভিত্তিতে নির্ধারিত হলেও কয়েকটি অংশ এখনও চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করা হয়নি। ২০১৮ সালে ভারত সরকার সংসদকে জানায়, অবশিষ্ট অংশগুলো দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে চিহ্নিত করা হবে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নতুন করে ৯টি সীমান্তস্তম্ভ স্থাপনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

মণিপুর সীমান্তের সবচেয়ে সংবেদনশীল এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে ৬৪ থেকে ৬৮ নম্বর সীমান্তস্তম্ভের মধ্যবর্তী মোলচাম এলাকা, ৭৫ থেকে ৭৯ নম্বর স্তম্ভের মধ্যবর্তী মোরেহ এলাকা এবং ৮৮ থেকে ৯৫ নম্বর স্তম্ভের মধ্যবর্তী চোরো খুনৌ এলাকা।

ভারত বরাবরই দাবি করে আসছে, মিয়ানমারের সঙ্গে তাদের কোনও বিস্তৃত সীমান্ত বিরোধ নেই; কেবল ৯টি সীমান্ত স্তম্ভ সংক্রান্ত অমীমাংসিত বিষয় রয়েছে, যা দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়ায় সমাধানের চেষ্টা চলছে।

দ্য ডিপ্লোম্যাট আরও জানায়, গত মাসে মিয়ানমারের নেতা মিন অং হ্লাইংয়ের ভারত সফরের সময় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। উভয় পক্ষ ৬৫ থেকে ৬৮ নম্বর সীমান্তস্তম্ভের মধ্যবর্তী মোলচাম এলাকায় নতুন ও সহায়ক সীমান্তস্তম্ভ স্থাপন এবং ২০১৭ সালে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত সীমান্তরেখা পর্যালোচনার বিষয়েও আলোচনা করেছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভূখণ্ড বিনিময়ের নজির

প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভূখণ্ড বিনিময়ের অভিজ্ঞতা ভারতের নতুন নয়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্থলসীমান্ত চুক্তি (এলবিএ) বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের ছিটমহল বিনিময় হয়। ওই চুক্তির আওতায় ভারত তার ভূখণ্ডে থাকা ১১১টি বাংলাদেশি ছিটমহল বাংলাদেশকে হস্তান্তর করে এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি ভারতীয় ছিটমহল গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সীমান্ত জটিলতার অবসান ঘটে।

মণিপুরে শুরু হয়েছে বিরোধিতা

সম্ভাব্য ভূখণ্ড বিনিময়ের খবর প্রকাশের পর থেকেই মণিপুরে বিরোধিতা শুরু হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দ্য ইম্ফল টাইমস জানিয়েছে, মণিপুর ইন্টেগ্রিটি সমন্বয় কমিটি (কোকোমি) কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, রাজ্যের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডও যেন মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করা না হয়।

সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে তারা ব্যাপক জনআন্দোলন গড়ে তুলবে।

২৭ জুলাই দেওয়া এক বিবৃতিতে কোকোমি জানায়, “প্রতিবেদনের তথ্য সত্য হলে এবং এ প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হলে কোকোমি নীরব দর্শক হয়ে থাকবে না।”

তাদের দাবি, মণিপুরের ভৌগোলিক অখণ্ডতা কোনওভাবেই আলোচনার বিষয় হতে পারে না। সংগঠনটির ভাষ্য, ১৯৪৯ সালে ভারতীয় ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর থেকেই মণিপুর তার ঐতিহাসিক ভূখণ্ডের একটি অংশ হারিয়েছে। তাই রাজ্যের সীমানা আরও সংকুচিত করার যে কোনও উদ্যোগ জনগণ মেনে নেবে না।

কোকোমির মতে, মণিপুরের জনগণের সম্মতি ছাড়া রাজ্যের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে তা হবে ‘আগুন নিয়ে খেলা’।