পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরে আঞ্চলিক নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় দফার ভোটের আগে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ৩০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে নিষিদ্ধ ঘোষিত কাশ্মীরি একটি সংগঠনের নেতারা। তবে এ সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
গত ২৭ জুলাই মিরপুর, কোটলি ও ভিম্বার জেলার ১৩টি আসনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) ৯টি আসনে জয় পেয়েছে। নিরাপত্তাজনিত কারণে একদিনের পরিবর্তে তিন দফায় নির্বাচন আয়োজন করা হয়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফার ভোট হওয়ার কথা রয়েছে যথাক্রমে আজ রোববার (২ আগস্ট) ও আগামী ১০ আগস্ট।
২০২১ সালের নির্বাচনে জয়ী ইমরান খানের প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে ভোট বর্জন করেছে।
পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরে চলমান অস্থিরতার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, স্বায়ত্তশাসন নিয়ে প্রশ্ন এবং প্রতিনিধিত্বের সংকট।
সাংবিধানিকভাবে অঞ্চলটির আলাদা সরকার ও পরিষদ থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়ে ইসলামাবাদের প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বিশেষ করে আইনসভার ১২টি ‘শরণার্থী’ আসন নিয়ে কয়েক বছর ধরে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এসব আসনে ভোট দেন ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর থেকে পাকিস্তানে গিয়ে বসবাসকারী শরণার্থীরা, যাদের অনেকেই আজাদ কাশ্মীরের বাইরে থাকেন।
স্থানীয় আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, এই আসনগুলো ব্যবহার করে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক দলগুলো অঞ্চলটির ক্ষমতার ভারসাম্যে প্রভাব ফেলে। জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি এই আসনব্যবস্থার সংস্কারসহ নির্বাচনী সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে।
তাদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় স্থানীয় জনগণের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব সীমিত হচ্ছে। এ নিয়েই সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনার পেছনে রয়েছে অঞ্চলটির দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ। আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনপন্থী আন্দোলন জয়েন্ট আওয়ামী অ্যাকশন কমিটি (জেএএসি) গত জুনে আঞ্চলিক সরকারের নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ে। এরপর থেকেই বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ শুরু হয়। ব্যাংকিং, সড়ক যোগাযোগ ও ইন্টারনেট সেবায়ও ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেছে।
জেএএসি দাবি করেছে, রাওয়ালাকোট এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ৩০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত থাকায় এ তথ্য স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবারের সংঘর্ষে নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্য নিহত এবং আরও পাঁচজন আহত হয়েছেন। এছাড়া এক সরকারি কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মিরপুরে চলতি সপ্তাহে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অন্তত তিনজন নিহত হওয়ার তথ্য তিনি পেয়েছেন।
পাকিস্তানি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, বিক্ষোভের মধ্যে সশস্ত্র ও ভারত-সমর্থিত যোদ্ধারা যুক্ত হয়েছিল। তবে ভারত অতীতে এ ধরনের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
মুজাফফরাবাদের বাসিন্দা ফজল মাহমুদ বেগ বলেন, ‘পুরো নির্বাচনই একটি প্রতারণা।’ অন্যদিকে ইসলামাবাদে এক বিক্ষোভে সরদার মাজহার বলেন, ‘আমরা চাই এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান হোক।’
পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে রাজনৈতিক উত্তেজনার শিকড় কয়েক দশক পুরোনো। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ, অর্থনৈতিক অবহেলা এবং আঞ্চলিক অধিকার নিয়ে অসন্তোষ নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে।
২০২২ সালে বিদ্যুতের উচ্চমূল্যের প্রতিবাদে বড় ধরনের আন্দোলন হয়েছিল। অঞ্চলটি পাকিস্তানের অন্যান্য অংশে সস্তা জলবিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে নানা অর্থনৈতিক সমস্যার অভিযোগ করে আসছেন।
২০২৩ সালে গঠিত জেএএসি এসব অসন্তোষকে সংগঠিত করে এবং নির্বাচনী সংস্কারের দাবি তোলে। সংগঠনটির অভিযোগ, আঞ্চলিক আইনসভার ১২টি সংরক্ষিত আসনকে ইসলামাবাদ স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের জন্য ব্যবহার করে। তবে পাকিস্তান সরকার এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
দেশটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান আসকারির মতে, সরকার গঠনের জন্য পিএমএল-এনকে সম্ভবত সংরক্ষিত ১২টি আসনের প্রতিনিধিদের সমর্থন নিতে হবে। তবে এসব আসন নিয়ে বিতর্ক থাকায় নতুন সরকারের জন্য সমস্যার সমাধান কঠিন হতে পারে।
এদিকে সোমবারের নির্বাচনেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন দল ব্যালট বাক্স ছিনতাই ও ভোট কারচুপির পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে।
সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পিএমএল-এন ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) সমর্থকদের মধ্যে পৃথক সংঘর্ষে একজন নিহত ও কয়েকজন আহত হয়েছেন।


