ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত রাজ্যের (সেভেন সিস্টার্স) সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নেওয়া কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট ট্রান্সপোর্ট প্রকল্প (কেএমটিটিপি) দেড় দশক পেরিয়েও পূর্ণ বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, নিরাপত্তা সংকট, কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা, দুর্গম ভৌগোলিক পরিবেশ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কারণে ভারতের অন্যতম কৌশলগত এই অবকাঠামো প্রকল্প এখন বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় রয়েছে।

ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হিসেবে ২০০৮ সালে মিয়ানমারের সঙ্গে কালাদান প্রকল্পের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ২০১০ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। বঙ্গোপসাগর, সিত্তে বন্দর এবং কালাদান নদীপথ ব্যবহার করে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বিকল্প সংযোগ স্থাপনই ছিল প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য।

তবে কালাদান প্রকল্পের বর্তমান অচলাবস্থার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থান এবং এর পর শুরু হওয়া দেশব্যাপী সশস্ত্র সংঘাত। সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখলের পর মিয়ানমারজুড়ে যে গণপ্রতিরোধ ও সশস্ত্র বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে, তা দেশটির সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোকে চরম অস্থিতিশীল করে তোলে।

কালাদান প্রকল্পের প্রধান অংশ মিয়ানমারের রাখাইন ও চিন রাজ্যের মধ্য দিয়ে গেছে। বর্তমানে এই দুই অঞ্চলই দেশটির সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এসব অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই হারিয়েছে। ফলে যে সরকারের সঙ্গে চুক্তি করে ভারত প্রকল্পটির কাজ শুরু করেছিল, মাঠপর্যায়ে সেই সরকারের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখন আর নেই।

এই পরিস্থিতিতে রাখাইন ও চিন অঞ্চলের শক্তিশালী জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির উত্থান কালাদান প্রকল্পের পুরো সমীকরণ বদলে দিয়েছে। ২০২৪ সালের শুরুতে আরাকান আর্মি চিন রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ শহর পালেতওয়া এবং রাখাইন অঞ্চলের সিত্তে বন্দরের আশপাশের কৌশলগত এলাকাগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পালেতওয়া কালাদান প্রকল্পের নদীপথের শেষ প্রান্ত এবং সড়কপথের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হওয়ায় এর নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পটির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সংঘাতের কারণে প্রকল্প এলাকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির ব্যাপক অবনতি ঘটে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে নির্মাণাধীন সড়ক ও সেতুতে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে।

২০২৪ সালে আরাকান আর্মি পালেতওয়া ও সিত্তে বন্দরের আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর প্রকল্পের নদীপথ ও সড়কপথ উভয়ই কার্যত অচল হয়ে পড়ে। নিরাপত্তাহীনতার কারণে নির্মাণকাজে নিয়োজিত ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক, প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা প্রকল্প এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হন।

বিশ্লেষকদের মতে, কালাদান প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের কূটনৈতিক কৌশলেও সীমাবদ্ধতা ছিল। নয়াদিল্লি দীর্ঘদিন মিয়ানমারের আনুষ্ঠানিক সরকার ও সামরিক প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু দেশটির সীমান্ত ও প্রান্তিক এলাকাগুলোতে বর্তমানে কেন্দ্রীয় সরকারের চেয়ে স্থানীয় জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব অনেক বেশি কার্যকর।

অতীতে ভারত মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে অভিযানে সহযোগিতা করেছিল। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে আরাকান আর্মির মধ্যে ভারতের এই প্রকল্প নিয়ে সন্দেহ ও বিরূপ মনোভাব ছিল বলে বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত একটি জটিল কূটনৈতিক সমীকরণের মুখে পড়েছে। একদিকে প্রকল্প এলাকায় সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণ সীমিত হওয়ায় তাদের ওপর নির্ভর করা কঠিন, অন্যদিকে আরাকান আর্মির মতো একটি অ-রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সমঝোতায় যাওয়া ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বাধা এখন পালেতওয়া থেকে ভারতের মিজোরাম সীমান্তের জরিনপুই পর্যন্ত প্রায় ৪৯ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ। সংঘাত ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এই অংশের কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

যদিও সিত্তে বন্দর এবং কালাদান নদীপথের অবকাঠামো নির্মাণ অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে, তবু সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতির কারণে সেগুলো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ২০২৩ সালে উদ্বোধন হওয়া সিত্তে বন্দরও কার্যত অচল অবস্থায় রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের কূটনৈতিক কৌশলেও সীমাবদ্ধতা ছিল। নয়াদিল্লি শুরু থেকেই মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করেছে। কিন্তু প্রকল্প এলাকা নিয়ন্ত্রণকারী স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ না থাকায় বর্তমান বাস্তবতায় প্রকল্পটি বড় সংকটে পড়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ভারত অনানুষ্ঠানিকভাবে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সরাসরি সমঝোতা ভারতের জন্য কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয়।

নিরাপত্তা সংকটের পাশাপাশি দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, ভারী বর্ষণ, ভূমিধস এবং দুর্বল অবকাঠামোও প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে শুরু থেকেই নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের তুলনায় ধীরগতিতে এগিয়েছে।

এদিকে প্রকল্পের ব্যয়ও কয়েক গুণ বেড়েছে। ২০০৮ সালে প্রায় ১২ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ১ হাজার ১৪৯ কোটি ১২ লাখ ভারতীয় রুপি) ব্যয়ে অনুমোদিত প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় বর্তমানে প্রায় ৪৮ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, রাখাইন উপকূলে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতিও ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর এবং রাখাইনে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ ভারতের কালাদান প্রকল্পের কৌশলগত গুরুত্বকে আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে তুলেছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, মিয়ানমারে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে না আসা এবং প্রকল্প এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কালাদান প্রকল্পের পূর্ণ বাস্তবায়নের সম্ভাবনা সীমিত থাকবে। যদিও ভারত ২০২৭ সালের মধ্যে প্রকল্পটি চালুর আশা করছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয় কাটেনি।