যুদ্ধ, সংঘাত ও সহিংসতায় বিপর্যস্ত বিশ্বে শান্তির বার্তা নিয়ে আজ (২১ সেপ্টেম্বর) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস। জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর দিবসটি পালিত হয়। এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘শান্তিতে বিনিয়োগ করুন-সবার জন্য, সর্বত্র, প্রতিদিন’।

আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের মূল লক্ষ্য যুদ্ধ ও সংঘাত বন্ধ করে বিশ্বজুড়ে শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করা। একই সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ ও সশস্ত্র সংঘাত শান্তি প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, গাজা ও ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত, সুদানের গৃহযুদ্ধ, মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং ইয়েমেনের লড়াইয়ে বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। সিরিয়া, কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল এবং আফ্রিকার সাহেল অঞ্চলের বিভিন্ন দেশেও সশস্ত্র সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।

এসব সংঘাতের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও জ্বালানি সংকট, অর্থনৈতিক চাপ, শিক্ষা ও চিকিৎসাব্যবস্থার বিপর্যয় এবং মানবিক সংকটের প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে। সংঘাতের কারণে লাখো মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিরাপত্তার সন্ধানে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

বাংলাদেশও দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের সংঘাতের প্রভাব বহন করছে। ২০১৭ সালের পর থেকে মিয়ানমার থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোতে তাদের বসবাসের ফলে মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারে চলমান সংঘাতের কারণে নতুন করে মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

যেভাবে শুরু হয়েছিল শান্তি দিবস
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের সূচনা হয় ১৯৮১ সালে। ওই বছর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৩৬/৬৭ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে সেপ্টেম্বর মাসে সাধারণ পরিষদের নিয়মিত অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনকে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। প্রথম দিবস পালিত হয় ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে।

তখন দিনটির নির্দিষ্ট তারিখ ছিল না। সাধারণ পরিষদের অধিবেশন শুরুর তৃতীয় মঙ্গলবার দিবসটি পালিত হতো। পরে ২০০১ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ৫৫/২৮২ নম্বর প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে দিনটিকে বৈশ্বিক যুদ্ধবিরতি ও অহিংসার দিন হিসেবে পালনের আহ্বান জানানো হয়।

২০০২ সাল থেকে নির্ধারিত ২১ সেপ্টেম্বরেই দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

শান্তির ঘণ্টা শান্তির প্রতীক
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের অন্যতম প্রতীক জাতিসংঘ সদর দপ্তরের ‘জাপানি শান্তির ঘণ্টা’। ১৯৫৪ সালের ৮ জুন ঘণ্টাটি জাতিসংঘ সদর দপ্তরে পৌঁছায়। জাতিসংঘ অ্যাসোসিয়েশন অব জাপানের উপহার হিসেবে দেওয়া এই ঘণ্টা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের দেওয়া মুদ্রা ও পদক দিয়ে তৈরি করা হয়।

প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর শান্তি দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এই ঘণ্টা বাজানোর ঐতিহ্য রয়েছে। ঘণ্টাটি যুদ্ধ ও সংঘাতের ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার প্রতীক হিসেবে কাজ করে।

শুধু যুদ্ধ বন্ধ নয়, শান্তির পরিধি আরও বিস্তৃত
আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের তাৎপর্য শুধু যুদ্ধ বন্ধের আহ্বানে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের মৌলিক অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা, বৈষম্য কমানো, দারিদ্র্য ও অবিচারের মতো সংঘাতের মূল কারণ মোকাবিলা এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শান্তি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, বাসস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, সামাজিক সংহতি ও টেকসই উন্নয়নের বিষয়গুলোও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। কোনো একটি অঞ্চলের সংঘাত যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন তার প্রভাব অর্থনীতি, পরিবেশ, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ে।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, সদস্যরাষ্ট্র, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করা সংগঠনগুলো দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করে। শিক্ষা, জনসচেতনতা ও সংলাপের মাধ্যমে শান্তির সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে যুদ্ধ ও সহিংসতা অব্যাহত থাকার বাস্তবতায় এবারের আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে-শান্তি শুধু যুদ্ধের অনুপস্থিতি নয়; মানুষের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অধিকারভিত্তিক জীবন নিশ্চিত করাও শান্তির অপরিহার্য অংশ। তাই ২১ সেপ্টেম্বর যুদ্ধের পরিবর্তে সংলাপ, সহিংসতার পরিবর্তে সমঝোতা এবং ধ্বংসের পরিবর্তে মানুষের জীবন ও মর্যাদাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানানোর দিন।