জাতিসংঘে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও মোয়ে তুনকে ‘অবৈধভাবে’ দায়িত্বে থাকার অভিযোগ করেছে দেশটির সামরিক সরকার। অং সান সু চির সরকারের নিয়োগ দেওয়া এই রাষ্ট্রদূতের পরিবর্তে সামরিক সরকারের মনোনীত প্রার্থীকে গ্রহণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে জাতিসংঘের সিদ্ধান্তের প্রস্তুতির মধ্যেই রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) এ দাবি করা হলো। খবর মিজজিমার।
২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নোবেলজয়ী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এরপর থেকেই দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলছে। এর মধ্য দিয়ে এক দশকের গণতান্ত্রিক শাসনেরও অবসান ঘটে।
সম্প্রতি জাতিসংঘ একটি ক্রেডেনশিয়ালস কমিটি গঠন করেছে। মিয়ানমারের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য নেপিদোর মনোনীত প্রার্থীকে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, নাকি সামরিক অভ্যুত্থানের বিরোধিতা করে আসা কিয়াও মোয়ে তুনকেই বহাল রাখা হবে—কমিটিটি সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
তবে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে সামরিক সরকারের দাবি উপেক্ষা করে জাতিসংঘে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করে আসছেন কিয়াও মোয়ে তুন।
রাষ্ট্রীয় সংবাদপত্র গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা অমান্য, রাষ্ট্রদ্রোহ এবং ‘সন্ত্রাসী সংগঠনের’ সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগে ২০২১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কিয়াও মোয়ে তুনকে সরকারি চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়।
বরখাস্ত হওয়ার এক দিন আগে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া এক আবেগঘন ভাষণে তিনি সামরিক অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে ‘সর্বোচ্চ সম্ভাব্য পদক্ষেপ’ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এরপরই সামরিক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন সু চির সরকারের নিয়োগ দেওয়া এই রাষ্ট্রদূত।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিয়াও মোয়ে তুনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সম্পদের অপব্যবহারের অভিযোগও এনেছে। নিউইয়র্কে জাতিসংঘে মিয়ানমারের স্থায়ী মিশনের কার্যালয় ব্যবহারের বিষয়টিও এর মধ্যে রয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাসিত বিরোধী গোষ্ঠী ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্টের সঙ্গে কাজ করার অভিযোগও করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। সামরিক সরকার NUG-কে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, জাতিসংঘে কিয়াও মোয়ে তুনের প্রতিনিধিত্ব অব্যাহত থাকা তার বৈধতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি নয়। এটি একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা এবং ক্রেডেনশিয়ালস কমিটির সিদ্ধান্ত প্রতিবছর পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কিয়াও মোয়ে তুনকে সরিয়ে সামরিক সরকারের মনোনীত প্রার্থীকে গ্রহণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া জাতিসংঘের ক্রেডেনশিয়ালস কমিটিতে রয়েছে বাহামাস, বেলজিয়াম, বেনিন, চীন, জ্যামাইকা, রাশিয়া, উগান্ডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভানুয়াতু।
চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারের সামরিক সরকারের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তারা দেশটিকে সামরিক সরঞ্জাম ও কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে আসছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক সরকারের শীর্ষ নেতাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। তাদের মধ্যে সামরিক সরকারের প্রধান মিন অং হ্লাইংও রয়েছেন।
জাতিসংঘের ক্রেডেনশিয়ালস কমিটি সাধারণত প্রতিবছর নভেম্বরের দিকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে।
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সামরিক সরকার বহু দেশের রাজধানীতে কার্যত কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে সামরিক বাহিনীর প্রধানের পদ থেকে অবসর নিয়ে গত এপ্রিল মাসে বেসামরিক ‘প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মিন অং হ্লাইং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছেন।
এদিকে সামরিক বাহিনী, গণতন্ত্রপন্থী যোদ্ধা ও বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে মিয়ানমারে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ACLED-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের পর থেকে এই সংঘাতে সব পক্ষ মিলিয়ে এক লাখের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।


