মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে বিধ্বংসী সংঘাতগুলোর একটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত চলা এই যুদ্ধে প্রায় ৪০টিরও বেশি দেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে। প্রাণ হারান প্রায় দুই কোটির বেশি মানুষ এবং আহত হন আরও কয়েক কোটি। যুদ্ধের পর বিশ্বের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে যায়, ভেঙে পড়ে শতাব্দীপ্রাচীন সাম্রাজ্য, জন্ম নেয় নতুন রাষ্ট্র এবং এমন এক আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পথও প্রশস্ত করে।
ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর একটি হলো—প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কেন শুরু হয়েছিল এবং একটি আঞ্চলিক সংঘাত কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্বযুদ্ধে রূপ নিয়েছিল?
সারায়েভোতে যে হত্যাকাণ্ড বদলে দিয়েছিল বিশ্বের ইতিহাস
১৯১৪ সালের ২৮ জুন। বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভো সফরে যান অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ এবং তার স্ত্রী সোফি।
সেদিন সকালে তাদের গাড়িবহর লক্ষ্য করে প্রথমে একটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। তবে সেটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ায় তারা প্রাণে বেঁচে যান। অনেকেই ধারণা করেছিলেন, এরপর সফর বাতিল করা হবে। কিন্তু ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ নির্ধারিত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
পরে আহত সেনাসদস্যদের দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার পথে চালকের ভুলে গাড়িটি এমন একটি রাস্তায় ঢুকে পড়ে, যেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন বসনিয়ান সার্ব জাতীয়তাবাদী যুবক গ্যাভরিলো প্রিন্সিপ।
সুযোগ পেয়ে খুব কাছ থেকে দুটি গুলি করেন তিনি। একটি গুলি ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দের গলায় এবং অন্যটি তার স্ত্রী সোফির পেটে লাগে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুজনের মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি ছিল মাত্র কয়েক সেকেন্ডের। কিন্তু এর প্রভাব ছিল শতাব্দীব্যাপী।
কে ছিলেন ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ?
১৮৬৩ সালে জন্ম নেওয়া ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ছিলেন অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সম্রাট ফ্রাঞ্জ জোসেফের ভাতিজা।
শুরুতে তিনি সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন না। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে সম্রাটের ছেলে রুডলফের আত্মহত্যা এবং সম্রাটের ভাই কার্ল লুডভিগের মৃত্যুর পর তিনিই সাম্রাজ্যের প্রথম উত্তরাধিকারী হন।
তার মৃত্যুর অর্থ ছিল শুধু একজন রাজপুত্রের মৃত্যু নয়; এটি ছিল ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ শাসককে হত্যা করা।
কেন তাকে হত্যা করা হয়েছিল?
এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল বলকান অঞ্চলের জটিল রাজনীতি।
১৯০৮ সালে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে। কিন্তু ওই অঞ্চলের বড় একটি অংশ নিজেদের সার্ব জাতির অংশ মনে করত।
সার্ব জাতীয়তাবাদীদের লক্ষ্য ছিল বসনিয়া, সার্বিয়া এবং অন্যান্য স্লাভ অধ্যুষিত অঞ্চলকে একত্র করে একটি ‘গ্রেটার সার্বিয়া’ গঠন করা।
অন্যদিকে অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সাম্রাজ্য বসনিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে বনজ সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে শোষণ, বৈষম্য এবং রাজনৈতিক বঞ্চনার অভিযোগ ছিল।
এই পরিস্থিতিতে জাতীয়তাবাদী সংগঠনগুলোর কাছে ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ ছিলেন দখলদার শাসনের প্রতীক।
গ্যাভরিলো প্রিন্সিপ গ্রেপ্তারের পর বলেন, তিনি স্লাভ জনগণের স্বাধীনতার জন্যই এই হামলা চালিয়েছেন।
হত্যাকাণ্ড থেকে যুদ্ধ
হত্যার পর অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সরাসরি সার্বিয়াকে দায়ী করে।
২৩ জুলাই সার্বিয়ার কাছে ১০ দফা কঠোর আল্টিমেটাম পাঠানো হয়। সার্বিয়া অধিকাংশ শর্ত মেনে নিলেও বিদেশি কর্মকর্তাদের নিজেদের বিচারব্যবস্থায় হস্তক্ষেপের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এটিকে অগ্রহণযোগ্য ঘোষণা করে।
অবশেষে ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু এটিই ছিল কেবল শুরু।
কীভাবে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হয়?
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অনেক আগেই ইউরোপে দুটি বড় সামরিক জোট গড়ে উঠেছিল।
একদিকে ছিল ট্রিপল অ্যালায়েন্স, যেখানে জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি এবং ইতালি ছিল। যদিও যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইতালি নিরপেক্ষ থাকে এবং পরে মিত্রশক্তিতে যোগ দেয়।
অন্যদিকে ছিল ট্রিপল আন্তঁত, যেখানে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও রাশিয়া ছিল।
এই জোটগুলোর মূল নীতি ছিল—এক সদস্য আক্রান্ত হলে অন্যরা তার পাশে দাঁড়াবে।
এই প্রতিশ্রুতিই পরবর্তীতে পুরো ইউরোপকে যুদ্ধে টেনে আনে।
কয়েক সপ্তাহে যুদ্ধ যেভাবে ছড়িয়ে পড়ে
অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার পর সার্বিয়ার মিত্র রাশিয়া সেনা সমাবেশ শুরু করে।
জার্মানি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
কয়েক দিনের মধ্যে জার্মানি ফ্রান্সের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ ঘোষণা করে।
ফ্রান্সে দ্রুত পৌঁছাতে জার্মান বাহিনী নিরপেক্ষ বেলজিয়ামে প্রবেশ করে।
বেলজিয়ামের নিরপেক্ষতা রক্ষার প্রতিশ্রুতি থাকায় যুক্তরাজ্যও জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে পড়ে।
এরপর ইউরোপের প্রায় সব বড় শক্তি যুদ্ধে জড়িয়ে যায়।
ইউরোপের বাইরেও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুধু ইউরোপেই সীমাবদ্ধ ছিল না।
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অধীন ভারত, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আফ্রিকার বিভিন্ন উপনিবেশ থেকে লাখ লাখ সৈন্য যুদ্ধে অংশ নেন।
জাপান মিত্রশক্তির হয়ে যুদ্ধে যোগ দেয়।
পরে ওসমানীয় সাম্রাজ্য এবং বুলগেরিয়া কেন্দ্রীয় শক্তির পক্ষে যোগ দেয়।
১৯১৭ সালে জার্মান সাবমেরিন হামলা এবং জিমারম্যান টেলিগ্রামের পর যুক্তরাষ্ট্রও মিত্রশক্তির পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয়।
এর ফলে যুদ্ধের ভারসাম্য দ্রুত বদলে যায়।
যুদ্ধের ভয়াবহতা
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল শিল্পযুগের প্রথম বৃহৎ যুদ্ধ।
মেশিনগান, ভারী কামান, বিষাক্ত গ্যাস, ট্যাংক, সাবমেরিন এবং যুদ্ধবিমান প্রথমবারের মতো ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
পশ্চিম ফ্রন্টে শত শত কিলোমিটার দীর্ঘ ট্রেঞ্চ বা পরিখা খনন করা হয়।
একেকটি যুদ্ধ মাসের পর মাস চললেও অনেক সময় কয়েক কিলোমিটারের বেশি এলাকা দখল করা সম্ভব হয়নি।
ভার্দ্যাঁ, সোম এবং গ্যালিপলির মতো যুদ্ধক্ষেত্রে লাখ লাখ মানুষ নিহত হন।
যুদ্ধের সমাপ্তি
১৯১৮ সালের দিকে জার্মানি ও তার মিত্ররা অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
খাদ্যসংকট, শ্রমিক ধর্মঘট এবং সেনাবাহিনীর বিদ্রোহে দেশজুড়ে অস্থিরতা দেখা দেয়।
৯ নভেম্বর জার্মান সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেম সিংহাসন ত্যাগ করেন।
দুই দিন পর, ১১ নভেম্বর ১৯১৮ স্থানীয় সময় সকাল ১১টায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।
এর মধ্য দিয়ে চার বছরের রক্তক্ষয়ী প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
যুদ্ধের পর বদলে যায় বিশ্ব
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উসমানীয়, অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয়, জার্মান এবং রোমানভ—এই চারটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
ইউরোপে নতুন কয়েকটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
১৯১৯ সালে স্বাক্ষরিত ভার্সাই চুক্তিতে জার্মানির ওপর কঠোর ক্ষতিপূরণ আরোপ করা হয়।
অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এই চুক্তির কঠোর শর্তই পরবর্তীতে জার্মানিতে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং অ্যাডলফ হিটলারের উত্থানের পরিবেশ তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে বিশ্বকে ঠেলে দেয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ হত্যাকাণ্ড ছিল যুদ্ধের তাৎক্ষণিক কারণ, কিন্তু সেটিই একমাত্র কারণ নয়।
বহু বছর ধরে ইউরোপে চলা সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা, অস্ত্র প্রতিযোগিতা, উগ্র জাতীয়তাবাদ, বলকান অঞ্চলের সংকট এবং জটিল সামরিক জোটব্যবস্থা—সব মিলিয়ে ইউরোপ তখন এক বিস্ফোরণোন্মুখ পরিস্থিতিতে ছিল।
সারায়েভোর গুলির ঘটনা ছিল সেই জমে থাকা সংকটের বিস্ফোরণের সূচনা।
ইতিহাসবিদ রিচার্ড ফোগার্টির ভাষায়, যুদ্ধ শেষে সবাই একই প্রশ্ন করেছিলেন, ‘এত বড় যুদ্ধ আসলে কীভাবে শুরু হলো?’
এক শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে গবেষণা ও বিতর্ক আজও চলছে। তবে ইতিহাসবিদদের বেশির ভাগই একমত—প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কোনো এক দিনের ঘটনা ছিল না। এটি ছিল বহু বছরের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সামরিক জোট, সাম্রাজ্যবাদী প্রতিযোগিতা এবং জাতীয়তাবাদের সংঘর্ষের অনিবার্য পরিণতি।


