শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে কক্সবাজার জেলার ৩২৪টি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পূজামণ্ডপে নিয়মিত টহল, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্ট্রাইকিং রিজার্ভ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে কেউ নাশকতার পরিকল্পনা করলে কঠোরভাবে দমনের হুঁশিয়ারি দিয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-১৫।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেল চারটার দিকে টেকনাফ পৌরসভা কেন্দ্রীয় বিষ্ণু মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে এ হুঁশিয়ারি দেন কক্সবাজার এসআরবি-১৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার মো. মাহমুদুল রহমান।
পরিদর্শনকালে তিনি পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ে খোঁজখবর নেন। পরে পূজা উদযাপন কমিটির নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং কেক কেটে শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল খন্দকার মো. মাহমুদুল রহমান বলেন, “শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি বাঙালি সংস্কৃতির এক অখণ্ড অংশ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনার মিলনমেলা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে এই উৎসব আমাদের সামাজিক সৌহার্দ্যকে আরও সুদৃঢ় করে।”
নিরাপত্তা পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, “এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পূজামণ্ডপ ও আশপাশের এলাকায় এসআরবি সদস্যদের নিয়মিত টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারিও অব্যাহত রয়েছে।”
নাশকতার বিষয়ে সতর্ক করে এসআরবি-১৫ অধিনায়ক বলেন, “উৎসবকে কেন্দ্র করে কেউ যদি নাশকতার পরিকল্পনা করে, তাহলে তা কঠোরভাবে দমন করা হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এসআরবি সদস্যরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।”
জেলায় ৩২৪ মণ্ডপে প্রার্থনা
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কক্সবাজার জেলার ৩২৪টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫৪টি মণ্ডপে প্রতিমা পূজা এবং ১৭০টিতে ঘট পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছরের তুলনায় এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ছয়টি।
জেলার ৯টি উপজেলা ও পৌরসভাভিত্তিক তালিকায় সবচেয়ে বেশি পূজামণ্ডপ রয়েছে চকরিয়া উপজেলায়। সেখানে ৭১টি মণ্ডপে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া কুতুবদিয়ায় ৪৪টি, রামুতে ৩৭টি, কক্সবাজার সদর উপজেলায় ৩১টি, ঈদগাঁওয়ে ২৯টি, মহেশখালী উপজেলায় ২৮টি, কক্সবাজার পৌরসভায় ২৮টি, চকরিয়া পৌরসভায় ২৫টি, পেকুয়া ও উখিয়ায় নয়টি করে এবং মহেশখালী পৌরসভা ও টেকনাফে ছয়টি করে মণ্ডপ রয়েছে। উখিয়ার তালিকায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের একটি মণ্ডপও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মণ্ডপভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, কক্সবাজার সদর উপজেলা, কক্সবাজার পৌরসভা ও ঈদগাঁওয়ে মোট ৮৮টি মণ্ডপে পূজা হচ্ছে। এর মধ্যে ৪৬টিতে প্রতিমা পূজা এবং ৪২টিতে ঘট পূজার আয়োজন করা হয়েছে। চকরিয়া উপজেলার ৭১টি মণ্ডপের মধ্যে ৪১টিতে প্রতিমা পূজা ও ৩০টিতে ঘট পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
কুতুবদিয়ার ৪৪টি মণ্ডপের মধ্যে ১৪টিতে প্রতিমা পূজা এবং ৩০টিতে ঘট পূজা হচ্ছে। রামুর ৩৭টি মণ্ডপের মধ্যে ২৩টিতে প্রতিমা পূজা ও ১৪টিতে ঘট পূজার আয়োজন করা হয়েছে। টেকনাফের ছয়টি মণ্ডপের মধ্যে পাঁচটিতে প্রতিমা পূজা এবং একটিতে ঘট পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উখিয়ায় রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরের মণ্ডপসহ নয়টি মণ্ডপে প্রতিমা পূজার আয়োজন করা হয়েছে।
বিসর্জন ঘিরে সৈকতে থাকবে বাড়তি নিরাপত্তা
দুর্গোৎসবের শেষ পর্বে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের লাবণী পয়েন্টে প্রতিমা বিসর্জন ঘিরে বিপুল মানুষের সমাগমের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এ আয়োজন নির্বিঘ্ন করতে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তার পাশাপাশি পর্যটক, দর্শনার্থী ও উৎসবে অংশ নেওয়া মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতেও বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের কক্সবাজার জেলা শাখার নেতাদের ভাষ্য, প্রতিমা বিসর্জন অনুষ্ঠান সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা ও বিশেষায়িত সংস্থার সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করবেন।
এদিকে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন ও নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগে টেকনাফের হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে স্বস্তি দেখা দিয়েছে। পূজা উদযাপন কমিটির নেতারাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী টেকনাফ থেকে শুরু করে জেলার অন্যান্য পূজামণ্ডপ এবং বিসর্জনস্থল ঘিরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। দুর্গোৎসবের শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
টেকনাফের বিষ্ণু মন্দির পরিদর্শনকালে এসআরবি-১৫-এর সিপিসি-১-এর অধিনায়ক, টেকনাফ থানা পুলিশের সদস্য, মন্দিরের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ পূজা উদযাপন কমিটির নেতারা উপস্থিত ছিলেন।


