‘সবাই পুড়ে কয়লা হয়ে গেছেন। আরও কেউ বেঁচে নেই’—এই আশঙ্কা আর স্বজন হারানোর অসহনীয় বেদনা নিয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের সামনে অপেক্ষা করছেন একের পর এক মানুষ। কারও অপেক্ষা স্ত্রী-সন্তানের, কারও পুরো পরিবারের, কেউ খুঁজছেন প্রিয় ভাগিনা-ভাগনিদের। মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে তারা জানেন না, যাদের সঙ্গে হাসিমুখে সময় কাটানোর কথা ছিল, তাদের শেষবারের মতো দেখতে পাবেন কি না। চোখের সামনে অনিশ্চয়তা, বুকের ভেতর হাহাকার—প্রিয়জনের পরিচয় আর শেষ বিদায়ের অপেক্ষায় যেন থমকে গেছে তাদের পৃথিবী।
উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর দুই দিনের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া মরদেহগুলো পরিচয় শনাক্তে বাড়ছে উদ্ধেগ। উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন ১১ জন। বিকৃত মরদেহ শনাক্ত করতে নেওয়া হয়েছে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ।
নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাহিদুর রহমান, তার স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি ও দুই শিশুকন্যা। নিখোঁজ রয়েছেন ছাত্রদল নেতা ফয়সাল দেওয়ানের স্ত্রী মুক্তাও।
নাহিদুরের চাচাতো ভাই মোহাম্মদ খালিদ বলেন, ‘শুক্রবার সকালে নাহিদুর ফোন দিয়েছিল। বলেছিল, দেখা করব। শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুনের ঘটনা শোনার পর যখন ওকে আবার ফোন দিলাম, ফোন আর ধরল না। তখনই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠছিল।’
স্ত্রী মুক্তার খোঁজে মর্গের সামনে অপেক্ষা করছেন ফয়সাল দেওয়ান। তিনি বলেন, ‘আমার আর হারাবার কিছু নেই। আইনের কাছে আমরা বাঁধা। প্রক্রিয়া শেষে যেন দ্রুত স্ত্রীর মরদেহটা ফিরে পাই। যেন শেষবারের মতো সুন্দরভাবে তাকে বিদায় জানাতে পারি, দাফনের কাজটুকু সম্পন্ন করতে পারি।’
ঢাকা থেকে কক্সবাজারে এসেছেন ডলার মাহমুদ। তার চাচাতো বোনের মেয়ে তাজিন, তাজিনের স্বামী নাহিদুর ও তাদের দুই সন্তান নিখোঁজ। ডলার মাহমুদ বলেন, ‘চাচাতো বোনের কাছেই বড় হয়েছি আমি, তাই এই বিপদে সবচেয়ে বেশি দায়িত্বটা আমারই। খবর পাওয়ার পর থেকে স্থির থাকতে পারিনি। পোড়া রিসোর্টে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে খুঁজেছি, এখন মর্গে আইনি জটিলতা মেটানোর চেষ্টা করছি।’
শৌচাগার থেকে জড়াজড়ি অবস্থায় উদ্ধার হওয়া তিনটি মরদেহ নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের ধারণা, তারাই নাহিদুরের পরিবারের সদস্য।’ তবে এ ধারণার সত্যতা এখনো নিশ্চিত হয়নি।
এদিকে ফারিহা কবির ও তার শিশুসন্তান ফায়িজান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী (জেরিফ), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মিলিতা মেহেজাবিন আলভী ও ইসরাত জাহান মালিহার খোঁজ করছেন তাদের স্বজনেরা। তাদের খোঁজে উদ্বিগ্ন ইলিয়াস, রিয়াজ মাহমুদ রিপন ও আমিনুল ইসলাম।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, নিখোঁজদের অবস্থান নিশ্চিত করতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক লোকেশনসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করছে।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) জানান, অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধ্বংসস্তূপের সব জায়গায় তল্লাশি চালানো সম্ভব হয়নি। ওপরের কাঠের তলাগুলো ভেঙে পড়ায় কেউ চাপা পড়ে আছেন কি না, তা দেখতে নতুন করে তল্লাশি চলছে।
প্রিয়জনের পরিচয় নিশ্চিত করতে এখন ডিএনএ পরীক্ষার ফলের অপেক্ষা। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে স্বজনদের এই অপেক্ষা শুধু নিখোঁজদের খোঁজ পাওয়ার নয়, অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে শেষবারের মতো বিদায় জানানোরও।


