পাহাড়ের কৃষিতে বৈচিত্র্য আনতে পারলে বাড়তে পারে কৃষকের আয়, তৈরি হতে পারে নতুন বাজারের সুযোগ। প্রচলিত ধান ও সবজি চাষের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনের এমন সম্ভাবনাই দেখাচ্ছে ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধান। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে এই ধানের চাষ শুরু করেছেন তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা এনামুল হক এনাম। ১২ শতক জমিতে তাঁর এই উদ্যোগ সফল হলে পাহাড়ের কৃষিতে নতুন ফসল যুক্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকদের জন্য তৈরি হতে পারে বাড়তি আয়ের সুযোগ।
পানছড়ি উপজেলার গোলাক প্রতিমাছড়া এলাকার ধানক্ষেতে এখন দুলছে কালচে রঙের ধানের শিষ। সবুজ ধানগাছের ফাঁকে ব্যতিক্রমী এই দৃশ্য স্থানীয়দের নজর কাড়ছে। বগুড়া থেকে প্রতি কেজি ৫০০ টাকা দরে বীজ সংগ্রহ করে নিজস্ব জমিতে চাষ শুরু করেন এনামুল। প্রয়োজনীয় পরিচর্যার পর গাছে গাছে ধানের শিষ বের হতে শুরু করেছে। কোনো কোনো শিষ বেশ বড় ও পরিপুষ্ট হওয়ায় ভালো ফলনের আশা করছেন তিনি।
উদ্যোক্তা এনামুল হক এনাম জানান, ১২ শতক জমিতে ব্ল্যাক রাইস চাষে কৃষি বিভাগের সহযোগিতা ও পরামর্শ পেয়েছেন। বিশেষ করে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ইব্রাহিম খলিল তাকে এই চাষে উৎসাহ জুগিয়েছেন। এবার জমি থেকে প্রায় চার মণ ধান পাওয়ার আশা করছেন তিনি। পরীক্ষামূলক চাষে ভালো ফলন পেলে আগামী বছর আরও বেশি জমিতে এই ধানের আবাদ করতে চান।
এনামুল বলেন, বাজারে ব্ল্যাক রাইসের চালের দাম তুলনামূলক বেশি। প্রতি কেজি চাল ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। ফলে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রেখে ভালো ফলন পাওয়া গেলে এই ফসল থেকে বাড়তি আয় করা সম্ভব। তাঁর লক্ষ্য, পরীক্ষামূলক চাষের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে আবাদ বাড়ানো।
পাহাড়ের কৃষি অর্থনীতিতে ব্ল্যাক রাইসের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী পানছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রাশিদুল কবির। তিনি বলেন, উপজেলায় ব্ল্যাক রাইসের পরীক্ষামূলক চাষ হয়েছে এবং গাছের ফলন ভালো দেখা যাচ্ছে। এটি পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ ফসল। এর আবাদ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকেরা তুলনামূলক বেশি দামে চাল বিক্রির সুযোগ পাবেন। কৃষকদের আগ্রহ বাড়াতে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা ও পরামর্শ দেওয়া হবে।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নয়ন্টু চাকমা বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্লকে এনামুল সমতল অঞ্চল থেকে বীজ এনে ব্ল্যাক রাইসের চাষ করেছেন। কৃষক পর্যায়ে এই চাষ ছড়িয়ে দেওয়া গেলে উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি কৃষকদের লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এটি উচ্চমূল্যের ফসল হওয়ায় পাহাড়ের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
পাহাড়ের কৃষিতে নতুন ফসল যুক্ত করার ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন নয়, বাজারব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। ব্ল্যাক রাইসের চালের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও কৃষকের প্রকৃত লাভ নির্ভর করবে বীজ, সার, শ্রম, পরিচর্যা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয়ের ওপর। পাশাপাশি উৎপাদিত চাল বিক্রির নিশ্চয়তা, ক্রেতার চাহিদা এবং বাজারজাতকরণের সুযোগও বিবেচনায় নিতে হবে।
কৃষি বিভাগের কারিগরি সহায়তার পাশাপাশি নির্ভরযোগ্য বীজ সরবরাহ, উৎপাদন খরচ নিরূপণ এবং সম্ভাব্য বাজারের সঙ্গে কৃষকদের সংযোগ তৈরি করা গেলে এ ধরনের উচ্চমূল্যের ফসল পাহাড়ের কৃষিতে বৈচিত্র্য আনতে পারে। এতে প্রচলিত ফসলের ওপর নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়ানোর নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সবুজ পাহাড়ের কৃষিতে কালো ধানের এই পরীক্ষামূলক আবাদ তাই শুধু একটি নতুন ফসল চাষের উদ্যোগ নয়; এটি সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্যকে ঘিরে বিকল্প আয়ের পথ খোঁজারও প্রচেষ্টা। এনামুলের ১২ শতক জমিতে ফলন ও লাভের হিসাব ইতিবাচক হলে পানছড়ির অন্য কৃষকেরাও এ চাষে আগ্রহী হতে পারেন। আর পরিকল্পিত সম্প্রসারণ ও বাজার সংযোগ নিশ্চিত করা গেলে ব্ল্যাক রাইস হয়ে উঠতে পারে পাহাড়ের কৃষি অর্থনীতিতে সম্ভাবনাময় সংযোজন।


