পাহাড়ের নিজস্ব সংস্কৃতি আর ধর্মীয় ঐতিহ্যের মেলবন্ধন। ত্রিপুরা নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ‘রিনা-রিসাই’ ও বাহারি অলংকারে সাজানো হয়েছে দেবী দুর্গাকে। দেবীর এমন ব্যতিক্রমী সাজে মুগ্ধ খাগড়াছড়ির খাগড়াপুরের ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের এ উদ্যোগ হয়ে উঠেছে সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত।
গত নয় বছর ধরে খাগড়াপুরের পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গাকে ত্রিপুরা নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক রিনা-রিসাই ও নিজস্ব অলংকারে সাজিয়ে আসছেন স্থানীয় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের লোকজন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সপ্তমীর পূজায় ঐতিহ্যবাহী সাজে দেবীকে দেখতে মণ্ডপে ভিড় করেন ভক্ত ও দর্শনার্থীরা।
ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে এ আয়োজন কেবল দেবীকে সাজানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং নিজেদের সংস্কৃতি, পরিচয় ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার একটি প্রয়াস। তাদের বিশ্বাস, নিজস্ব পোশাকে দেবী দুর্গাকে সাজানোর মধ্য দিয়ে দেবী যেন আরও আপন হয়ে ওঠেন। একই সঙ্গে ধর্মীয় আয়োজনের মাধ্যমে নিজেদের সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখা এবং তা ছড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
ঐতিহ্যবাহী পোশাকে দেবীকে দেখে উচ্ছ্বসিত স্থানীয় ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ। পূজার আয়োজন ঘিরে তাদের প্রত্যাশা, সারা বছর পাহাড়ের সব সম্প্রদায়ের মানুষ যেন সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারেন। সমাজে যেন অরাজকতা ও অশান্তি না থাকে, সম্প্রীতির বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
পূজামণ্ডপে আসা একাধিক ভক্তও দেবীর ব্যতিক্রমী সাজে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলংকারে দেবী দুর্গার এই সাজ পাহাড়ের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে তুলে ধরেছে। ধর্মীয় উৎসবের মধ্য দিয়ে নিজস্ব ঐতিহ্যকে ধারণ করার এ উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তারা প্রার্থনা করেন, পাহাড়ে বসবাসরত সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্প্রীতি অটুট থাকুক।
খাগড়াপুর পূজামণ্ডপের পুরোহিত তুর্য চক্রবর্তী বলেন, “এ আয়োজন অন্য জেলা বা উপজেলার পূজামণ্ডপের তুলনায় আলাদা। এখানে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের নিজস্ব ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও অলংকার দিয়ে দেবী দুর্গাকে সাজিয়েছেন। বিষয়টি দেখে আমি খুশি ও আনন্দিত।”
এদিকে শারদীয় দুর্গোৎসব ঘিরে খাগড়াছড়িতে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পূজামণ্ডপগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবক এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি পুলিশের নিয়মিত টহলও অব্যাহত রয়েছে।
খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খান বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বীরা যাতে নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে দুর্গাপূজা উদযাপন করতে পারেন, সে জন্য পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের পাশাপাশি পুলিশের নিয়মিত টহলও থাকবে।
এ বছর খাগড়াছড়ি জেলায় পাঁচটি ঘটপূজাসহ মোট ৬৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উৎসবকে ঘিরে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রত্যাশা, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হবে শারদীয় দুর্গোৎসব।
খাগড়াপুরে রিনা-রিসাই ও ঐতিহ্যবাহী অলংকারে দেবী দুর্গার এ সাজ যেন পাহাড়ের বহুমাত্রিক সংস্কৃতিরই প্রতিচ্ছবি। ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে নিজস্ব পরিচয়কে ধারণ করে এ আয়োজন মনে করিয়ে দেয়—সংস্কৃতির বৈচিত্র্যই সম্প্রীতির শক্তি, আর পারস্পরিক শ্রদ্ধাই পারে পাহাড়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করতে।


