পাহাড়ের ঢালে সারি সারি মাল্টার গাছ।সবুজ পাতার ফাঁকে ঝুলছে থোকায় থোকায় ফল। বাগানে ভালো ফলন, বাজারে চাহিদা—সব মিলিয়ে পাহাড়ের অনেক কৃষকের মুখে এখন স্বস্তির হাসি। মাল্টা চাষ বদলে দিয়েছে তাঁদের জীবিকা, তৈরি হয়েছে স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের কর্মসংস্থানও। তবে সম্ভাবনার এই বাগানে রয়েছে কিছু সংকটও। সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় একসঙ্গে ফল বাজারে উঠলে কমে যায় দাম। আবার বয়সী গাছের পাতা লালচে হয়ে যাওয়ায় নতুন করে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা। অপরিপক্ব ফল বাজারজাত করায় পাহাড়ি মাল্টার স্বাদ ও মান নিয়েও তৈরি হচ্ছে প্রশ্ন।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর খাগড়াছড়ি জেলায় প্রায় ৬০০ হেক্টর জমিতে মাল্টার চাষ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে গড়ে সাত টন উৎপাদন হিসাবে ফলন হতে পারে প্রায় ৪ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি মাল্টা বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। যথাযথ সংরক্ষণ, মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজারজাতের ব্যবস্থা করা গেলে এ ফল পাহাড়ের কৃষি অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

খাগড়াছড়িতে মাল্টা চাষের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বারি মাল্টা-১ জাত। ২০০৬ সালে খাগড়াছড়ি পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে কৃষিবিজ্ঞানীরা জাতটি উদ্ভাবন করেন। পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে উপযোগী হওয়ায় ধীরে ধীরে বিভিন্ন এলাকায় বাড়তে থাকে মাল্টার চাষ। বর্তমানে এই জাতের পাশাপাশি অন্য জাতের মাল্টাও চাষ করছেন কৃষকেরা।

স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি জেলার বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের কাছেও পাহাড়ি মাল্টার চাহিদা রয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে বাগান থেকেই বিক্রি হয়ে যাচ্ছে উৎপাদিত ফল। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি পাহাড়ের কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতেও তৈরি হচ্ছে নতুন সম্ভাবনা।

মাল্টা চাষি নুর আলম ও মোতালেব জানান, এ চাষ থেকে আয়ের পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাগানের পরিচর্যা, সেচ, আগাছা পরিষ্কার ও ফল সংগ্রহের কাজে স্থানীয় শ্রমিকেরা কাজ করছেন। তাঁদের ধারণা, জেলার তিন থেকে পাঁচ হাজার শ্রমিক কোনো না কোনোভাবে মাল্টাবাগানের সঙ্গে যুক্ত। ফলে মাল্টা চাষ শুধু কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না, গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের জীবিকাতেও অবদান রাখছে।

তবে কৃষকদের বড় সমস্যা ফল সংরক্ষণ। কোল্ডস্টোরেজ বা উপযুক্ত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় মৌসুমে একসঙ্গে বেশি মাল্টা বাজারে এলে দাম কমে যায়। দীর্ঘ সময় ফল ধরে রাখার সুযোগ না থাকায় কৃষকদের বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়। এতে ভালো ফলন হলেও কাঙ্ক্ষিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এর পাশাপাশি কিছু বাগানে ছয়-সাত বছর বয়সী গাছের পাতা লালচে হয়ে যাওয়ায় উদ্বিগ্ন কৃষকেরা। কেন এমন হচ্ছে, তা শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না গেলে ভবিষ্যৎ ফলন ও উৎপাদন ব্যয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে, অধিক লাভের আশায় কিছু ক্ষেত্রে পরিপক্ব হওয়ার আগেই মাল্টা সংগ্রহ করে বাজারজাত করার অভিযোগ রয়েছে। এতে ফলের স্বাভাবিক মিষ্টতা ও স্বাদ কম থাকায় ক্রেতাদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই সঠিক সময়ে ফল সংগ্রহ এবং মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী জানান, অপরিপক্ব মাল্টা সংগ্রহ না করে সঠিক সময়ে ফল বাজারজাত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গাছের পাতা লালচে হয়ে যাওয়ার কারণ শনাক্ত করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়ি মাল্টার উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি সংরক্ষণ সুবিধা, কৃষকদের কারিগরি সহায়তা, ফলের মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজারজাতব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। এসব ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া গেলে খাগড়াছড়ির মাল্টা স্থানীয় বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে আরও বড় বাজারে জায়গা করে নিতে পারে। তাতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি পাহাড়ে কর্মসংস্থান ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশও ত্বরান্বিত হবে।