একসময় রাঙামাটি থেকে কাপড় এনে ঘরে বসে বিক্রি করতেন। মাসে আয় হতো ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা। তবে সীমিত আয়ের সেই ব্যবসায় থেমে থাকেননি খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার নারী উদ্যোক্তা মিতা চাকমা। স্বপ্ন দেখেছেন নিজের কারখানা গড়ার, হয়েছেন উৎপাদক। স্বামী স্বদেশ প্রীতি চাকমার সহযোগিতায় গড়ে তুলেছেন ‘মিতা টেক্সটাইল’। এখন তাঁর কারখানায় তৈরি হচ্ছে পাহাড়ি নারীদের ঐতিহ্যবাহী পিনোন-হাদি, গামছাসহ বিভিন্ন বস্ত্র। নিজের স্বাবলম্বিতা অর্জনের পাশাপাশি সেখানে কর্মসংস্থান হয়েছে ২০ জনের।
খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ির নতুন পাড়া গ্রামে গড়ে ওঠা এই কারখানা ঘিরে তৈরি হয়েছে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ। এখানকার উৎপাদিত বস্ত্র একদিকে যেমন পাহাড়ের ঐতিহ্যকে ধারণ করছে, অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন ও আয়ের নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
মিতা চাকমার উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প অবশ্য শুরু হয়েছিল আরও আগে। প্রায় আট বছর আগে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে গবাদিপশু পালন শুরু করেন তিনি। পাশাপাশি বিভিন্ন সমিতিতে সঞ্চয় করতে থাকেন টাকা। পরে প্রায় পাঁচ বছর রাঙামাটি থেকে কাপড় এনে বিক্রি করেন। এ সময় ব্যবসার অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বড় কিছু করার স্বপ্নও লালন করেন।
সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে একসময় নিজেই বস্ত্র উৎপাদনের উদ্যোগ নেন। স্বামীর সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠা করেন মিতা টেক্সটাইল। কয়েক বছর আগে যাত্রা শুরু করা এই কারখানায় এখন নিয়মিত তৈরি হচ্ছে পাহাড়ি নারীদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পিনোন-হাদি, গামছাসহ বিভিন্ন বস্ত্র।
কারখানাটিতে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রেও রয়েছে নিজস্ব উদ্যোগ। প্রথমে কর্মীদের তিন মাস প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এরপর তাঁদের বেতনভুক্ত কর্মী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এতে কাজ শেখার পাশাপাশি স্থানীয় বেকার তরুণ-তরুণীদের উপার্জনের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কারখানার কর্মীরা জানান, এখানে কাজ করে অনেকে নিজেদের পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছেন। কেউ কেউ আয় দিয়ে পরিবারের ব্যয় নির্বাহেও ভূমিকা রাখছেন। স্থানীয়ভাবে কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় তাঁদের জীবনযাপনেও ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
বর্তমানে মিতা টেক্সটাইলে ২০ জন কর্মী কাজ করছেন। উদ্যোক্তা মিতা চাকমার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটিতে প্রতিদিন পিনোন-হাদির ৪০ সেটসহ মোট ৫১ সেট পাহাড়ি নারীদের পরিধেয় বস্ত্র তৈরি হচ্ছে। ভবিষ্যতে উৎপাদনের পরিধি বাড়িয়ে মাফলার ও লুঙ্গি তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর।
মিতা চাকমা জানান, ঘরে বসে কাপড় বিক্রির অভিজ্ঞতাই তাঁকে নিজস্ব কারখানা গড়ার সাহস জুগিয়েছে। ধীরে ধীরে ব্যবসা সম্প্রসারণের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান তৈরিও তাঁর উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
খাগড়াছড়ি জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুস্মিতা খীসা জানান, মিতা চাকমা সহযোগিতা চাইলে তাঁর উৎপাদিত পণ্য অধিদপ্তরের বিপণনকেন্দ্রে বিক্রির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তাঁকে ঋণসহায়তা দেওয়ার বিষয়েও সহযোগিতা করা হবে।
উদ্যোক্তা হিসেবে সাফল্যের স্বীকৃতিও পেয়েছেন মিতা চাকমা। ২০২৩ সালে প্রথমে উপজেলা পর্যায়ে এবং পরে জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ জয়িতা নির্বাচিত হন তিনি।
মিতা চাকমার এই উদ্যোগ দেখাচ্ছে, প্রশিক্ষণ, সঞ্চয়, অভিজ্ঞতা ও পারিবারিক সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে একজন নারী কীভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে উৎপাদনমুখী উদ্যোগে এগিয়ে যেতে পারেন। পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্পকে কেন্দ্র করে তাঁর কারখানা আরও সম্প্রসারিত হলে স্থানীয় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পোশাকের উৎপাদন ও বাজার সম্প্রসারণেরও সুযোগ তৈরি হতে পারে।


