মেঘের রাজ্য খ্যাত ‘সাজেক’ ২০০৮সালের দিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে মানুষের নজরে আসে। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে আধুনিক রাস্তা-ঘাট ও সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে জনপ্রিয় পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে উঠে।

বর্তমানে সাজেকে ছোট-বড় মিলে ১০০টির অধিক কটেজ রয়েছে। নভেম্বর থেকে জানুয়ারি এ তিন মাস মূলত সাজেকের পর্যটন মৌসুম। এ সময়ে কটেজ মালিকরা প্রায় ৩০ কোটি টাকার ব্যবসা করে থাকে এবং পর্যটকরা রেঁস্তোরায় খাওয়া-দাওয়ার জন্য খরচ করেন প্রায় ২২-২৫টাকার কাছাকাছি।

এছাড়াও পর্যটকদের জন্য গড়ে উঠেছে স্থানীয় পর্যায়ের হরেক রকমের পণ্য সামগ্রী দোকান। এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বছরে কয়েক কোটি টাকার বাণিজ্য করে। চান্দের (জীপ গাড়ি) গাড়িতে যাতায়াত, ঘোরাঘুরিতে পর্যটকরা ব্যয় করেন আরো প্রায় ৩০কোটি টাকর কাছাকাছি। সাজেকের পর্যটন খাতের একাধিক উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

সাজেকে পর্যটন ব্যবসা ছাড়াও কৃষি পণ্য আদা, হলুদ এবং ফুলঝাড়– ও বাঁশের জন্য বিখ্যাত।  প্রতি বছর এখানে উৎপাদিত এসব মসলা, ফুলঝাড়–  ও বাঁশের কয়েক কোটি টাকার ব্যবসা হয়ে থাকে।

সাজেকের উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য এবং দক্ষিণে মিজোরাম রাজ্য অবস্থিত। মূলত এসব রাজ্য থেকে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে সন্ত্রাসীরা অবৈধ অস্ত্র নিয়ে আসে সাজেকে। সাজেক শুরু থেকে প্রসীত বিকাশ খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’র (ইউপিডিএফ) দখলে ছিলো। তবে সাজেকের ভূয়াছড়ি নামক এলাকায় ভারতের বিছিন্নতাবাদী স্বশস্ত্র সন্ত্রাসীদের অবস্থান ছিলে বেশ পোক্ত। কয়েক বছর আগে সেনাবাহিনী ওই এলাকায় অভিযান চালালে স্বশস্ত্র সংগঠনটি ভারতের মিজোরামে সরে যায়।

এরপর পুরো এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করে চলে সশস্ত্র সংগঠন মূল ইউপিডিএফ। হোটেল-মোটেল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন খাত এমনকি পর্যটকদের জন্য সরবরাহ করা পানি থেকেও চাঁদা আদায় করে ইউপিডিএফ।

বেশ কয়েকমাস আগে সাজেকের ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের সশস্ত্র কমান্ডার তরুণ চাকমা ৫০জনের একটি দল নিয়ে পিসিজেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র দলে যোগ দিলে পিসিজেএসএস’র ক্যাডাররা নিজেদের আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদার ভাগ বসাতে সাজেকে বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করে প্রায় ৭০ভাগ এরিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।  স্থানীয় সংবাদকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে এসব তথ্য উঠেছে।

এখানে বলে রাখা ভাল; বাঘাইছড়ি উপজেলায় এম এন লারমা গ্রুপের পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস সংস্কার) সংস্কার গ্রুপ এক সময় দাপট দেখালেও আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর সংগঠনটি দুর্বল হয়ে পড়ে।

ইউপিডিএফ তাদের আধিপত্য বিস্তার বজায় রাখতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন সাজেকের উজোবাজার এলাকায় তাদের কর্মী, সমর্থকদের (নারী-পুরুষ) নিয়ে পিসিজেএসএসকে সাজেক থেকে বিতারিত করতে  অবরোধের মতো কর্মসূচি ডাক দেয়। এতে তাদের  ছায়া সংগঠন সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কার্বারী এসোসিয়েশন মাঠে নামে। ১১ থেকে ১৫ই অক্টোবর পর্যন্ত অবরোধ পালন করে সংগঠনগুলো। 

দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ১৬ থেকে ২১শে অক্টোবর পর্যন্ত আন্দোলন স্থগিত করলেও ২২ অক্টোবর ফের আন্দোলন শুরু করে। ২২অক্টোবর সকালে পর্যটকরা সাজেক ছাড়লে তাদের বাঁধা দেয় অবরোধকারীরা এবং গুলি ছুড়ে সন্ত্রাসীরা। এতে সেনাবাহিনীও পর্যটকদের নিরাপত্তার স্বার্থে গুলি ছুড়ে। অবরোধকারীদের ইট-পাটকলের আঘাতে কয়েকজন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য আহত হন।

শনিবার সাজেকে অবরোধকারীদের ওপর হামলার অভিযোগ এনে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় ২৪অক্টোবর থেকে সড়ক ও নৌপথে অর্ধদিবস অবরোধের ডাক দেয় ছাত্র-জনতা সংগ্রাম পরিষদ নামে ইউপিডিএফ’র আরেকটি ছায়া সংগঠন।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) রাঙামাটি জেলার সভাপতি ডা: গঙ্গা মানিক চাকমা বলেন,  এসব ঘটনার সাথে তারা জড়িত নয় বলে জানান তিনি। 

মূলত ইউপিডিএফই সংগঠন দুটিকে অবরোধে বাধ্য করেছে বলে যোগ করেন তিনি।

ইউপিডিএফ’র মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে নেওয়া কর্মসূচিতে তাদের সমর্থন থাকবে এবং ২২ তারিখের ঘটনায় কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠির সাথে নিরাপত্তা বাহিনীর গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে এমন তথ্যর প্রমাণ পায়নি বলে তিনি জানান।

বাঘাইছড়ি প্রেস ক্লাবের সভাপতি আব্দুল মাবুদ বলেন, সাজেক ইউপিডিএফ অধুষ্যিত অঞ্চল হলেও কয়েক মাস আগে থেকে পিসিজেএসএস এ অঞ্চলটির অধিকাংশ এলাকা দখলে নেয়। মূলত সংগঠন দু’টির আধিপত্য বিস্তার এবং চাঁদার ভাগাভাগি নিয়ে এসব ঘটনা  ঘটছে এবং সাজেকের পর্যটন খাত ধ্বংসের দাড়প্রান্তে বলে জানান তিনি।

রাঙামাটি পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব বলেন, সাজেকে স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে কাজ করছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীদের ওপর যৌথবাহিনীর প্রয়োজনীয় অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।