জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ও নেত্রকোণা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার কায়সার কামালের বক্তব্যকে ‘ইতিহাস বিকৃত ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটি।
সোমবার (১৮ মে) সকালে গণমাধ্যমে পাঠানো এক প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সংগঠনটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এ নিন্দা জানান। প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক জমির।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১৫ মে এক বক্তব্যে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ‘বাংলাদেশে আদিবাসীরা একসময় সমস্ত সম্পদের মালিক ছিল, তারপর আমরা বাঙালরা এসে একটু একটু করে নিয়ে তাদের জায়গায় বসবাস করেছি।’ পিসিসিপির দাবি, একজন সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তির কাছ থেকে এমন বক্তব্য দায়িত্বজ্ঞানহীন এবং তা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত বাঙালি জনগোষ্ঠীকে হেয় প্রতিপন্ন করেছে।
পিসিসিপির নেতৃবৃন্দের অভিযোগ, ডেপুটি স্পিকারের এই অমূলক ও উস্কানিমূলক বক্তব্যের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত প্রায় ৫৪ শতাংশ বাঙালি জনগোষ্ঠীকে চরমভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়েছে এবং এর ফলে সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী বাঙালিদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। উক্ত বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি মূলত ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ এবং দেশের সার্বভৌমত্বকে সরাসরি অস্বীকার করেছেন। আমরা স্পষ্টভাবে জানাতে চাই, বাঙালিরাই এ ভূখণ্ডের প্রকৃত ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র। বাংলাদেশে বাঙালি ছাড়া আর কোনো আদিবাসী নেই। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ নামের এই ভূখণ্ডে কখনোই অন্য কোনো আদিবাসীর বসবাস ছিল না। নৃতাত্ত্বিক সংজ্ঞায় আদিবাসীরা হচ্ছে কোনো অঞ্চলের আদি ও অকৃত্রিম ভূমিপুত্র বা ‘সান অব দ্য সয়েল’। অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, তারা কেউই এই অঞ্চলের আদি বাসিন্দা নয়, বরং বিভিন্ন সময়ে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহ থেকে এসে এখানে বসতি স্থাপন করেছে।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, ঐতিহাসিক দলিল ও প্রমাণ অনুযায়ী, চাকমারা মায়ানমারের চম্পকনগর থেকে ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে, তঞ্চঙ্গ্যারা মায়ানমারের আরাকান থেকে ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে এবং ত্রিপুরারা ৬৫ খ্রিস্টাব্দে চীনের ইয়াংসি ও হোয়াংহো নদীর উপত্যকা থেকে এ দেশে আগমন করে। একইভাবে বম জাতি সপ্তদশ শতকে চীনের চিনলুং এলাকা থেকে এবং মারমারা ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে মায়ানমার থেকে এ দেশে এসে আশ্রয় নেয়। অপরদিকে এই বাংলায় বাঙালিদের ইতিহাস হাজার হাজার বছরের পুরোনো। অথচ অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে ডেপুটি স্পিকারের মতো উচ্চপদস্থ ব্যক্তি ইতিহাসকে সম্পূর্ণ উল্টোভাবে উপস্থাপন করে বাঙালিদের বহিরাগত এবং উপজাতিদের আদি মালিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা চালাচ্ছেন।
বিবৃতিতে নেতৃবৃন্দ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, জাতিসংঘের আইএলও কনভেনশনের ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, কোনো জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তারা নির্দিষ্ট ভূমি ও ভূখণ্ডের ওপর স্বায়ত্তশাসনের অধিকার এবং সেখানে রাষ্ট্রীয় সামরিক কার্যক্রম বন্ধের দাবি করার আইনি সুযোগ পায়। ফলে উপজাতিদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে মেনে নেওয়ার অর্থ হলো দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া। এর ফলে রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড হাতছাড়া হওয়ার এবং দেশের অখণ্ডতা বিনষ্ট হওয়ার গভীর ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হতে পারে। একই সাথে এর আড়ালে জাতিসংঘ ভিত্তিক বিভিন্ন এনজিও সংস্থা এবং বিদেশি মিশনগুলো গোপনে পার্বত্য অঞ্চলে তাদের অপতৎপরতা ও ধর্মান্তকরণ কার্যক্রম জোরদার করার সুযোগ পাবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করছে, আমরা এই দেশের এক ইঞ্চি ভূখণ্ডকেও বিচ্ছিন্ন হতে দেব না। এ দেশের নাগরিক হিসেবে সকল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষিত থাকবে, কিন্তু ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে দেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলার কোনো চক্রান্ত বরদাশত করা হবে না। ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে অনতিবিলম্বে তার এই রাষ্ট্রদ্রোহী ও মনগড়া বক্তব্য প্রত্যাহার করে দেশবাসীর কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। অন্যথায় পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ ছাত্র-জনতা দেশের অখণ্ডতা রক্ষায় এবং এই ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে তুলতে বাধ্য হবে।


