মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী জুলাই ও আগস্ট মাসে রাখাইন ও চিন রাজ্যের আরাকান আর্মি (এএ) নিয়ন্ত্রিত শহরগুলোতে অন্তত ২৭টি বিমান হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় দুই শতাধিকের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন।

দ্য ইরাবতীর প্রতিবেদনে জানানো হয়, শুধু জুলাই মাসেই ১৫ জন নিহত এবং ৮৭ জন আহত হন। আগস্টে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৮ জনে, আহত হন আরও ৭৬ জন। অর্থাৎ দুই মাসে মোট ৫৩ জন বেসামরিক নিহত এবং ১৬৩ জন আহত হয়েছেন। প্রতিদিন গড়ে চারজন হতাহত হয়েছেন।

এর আগে অধিকাংশ বিমান হামলা একটি যুদ্ধবিমান দিয়ে পরিচালিত হলেও মার্চে মিন অং হ্লাইংয়ের স্থলাভিষিক্ত হয়ে ইয়ে উইন উ সামরিক প্রধান হওয়ার পর থেকে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী প্রতিটি হামলায় তিন বা তার বেশি যুদ্ধবিমান ব্যবহার করছে। এসব হামলার প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে বেসামরিক এলাকাগুলো।

বিখ্যাত নগাপালি সমুদ্রসৈকতের জন্য পরিচিত থানদওয়ে শহরে একাধিকবার বিমান হামলা চালানো হয়েছে। রাখাইনের রাথেদাউং, কিয়াউকতাও, গোয়া, কিয়েনতালি, পোন্যাগুন, ম্রাউক-উ, আন ও তাউংআপ এবং পার্শ্ববর্তী চিন রাজ্যের পালেতোয়া শহরও ব্যাপকভাবে হামলার শিকার হয়েছে।

নিহত ও আহতদের মধ্যে শিশু, স্কুলশিক্ষার্থী, ভিক্ষু, নারী ও বয়স্ক ব্যক্তিরাও রয়েছেন।

গোয়া টাউনশিপের এক বাসিন্দা বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ওপর পরিকল্পিত হামলাকে ‘চরম অমানবিক’ এবং সামরিক নিষ্ঠুরতারও ঊর্ধ্বে বলে বর্ণনা করেন।

তিনি বলেন, ‘এটি কোনো মানুষের মানসিকতা নয়। এটি ভাষায় প্রকাশেরও অতীত নিষ্ঠুরতা।’

নগাপালিসহ উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা বারবারের বিমান হামলায় নিজেদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছেন। এক গ্রামবাসী বলেন, ‘থানদওয়ে প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে এবং মানুষ প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছে। যুদ্ধে জিততে বেসামরিক মানুষ হত্যা করে কখনো সফল হওয়া যায় না।’

তিনি অভিযোগ করেন, আরাকান আর্মির মনোবল দুর্বল করার কৌশল হিসেবে জান্তা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্যবস্তু করছে।

আরাকান আর্মির মানবিক ও উন্নয়ন সহযোগিতা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে রাখাইনে জান্তার হামলায় ৮৩ জন বেসামরিক নিহত এবং ১৮৭ জন আহত হয়েছেন। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক দিক থেকে কোনো কৌশলগত মূল্য নেই-এমন স্কুল, মঠ ও আবাসিক এলাকাতেও হামলা চালিয়েছে সেনাবাহিনী।

রাখাইনভিত্তিক এক বিশ্লেষক বলেন, আরাকান আর্মিকে তথাকথিত শান্তি আলোচনায় যোগ দিতে বাধ্য করতে পুরোনো কৌশলই ব্যবহার করছে সামরিক বাহিনী।

তিনি বলেন, ‘নতুন নামে পুনর্গঠিত মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী একাধিক ফ্রন্টে লড়াইরত নিজেদের সেনাদের ওপর চাপ কমাতে চাইছে। তাই বেসামরিক মানুষ হত্যা করে আরাকান আর্মিকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করার চেষ্টা করছে। এসব কর্মকাণ্ড জঘন্য। যুদ্ধ হওয়া উচিত সেনাদের বিরুদ্ধে, নিরপরাধ সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে নয়।’

আরাকান আর্মির মুখপাত্র খাইং থুকা এসব বিমান হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী শান্তি আলোচনার কথা বলছে, কিন্তু এটি ছলনা ছাড়া কিছু নয়। সত্যিই যদি তাদের উদ্দেশ্য শান্তি হতো, তাহলে নির্বিচারে হত্যা বন্ধ করে আন্তরিকতার প্রমাণ দিত। তা না হলে এসব শুধু কথার কথা।’

এদিকে কিয়াউকফিউ টাউনশিপের তাউং মাও উ নৌঘাঁটির কাছে বর্তমানে তীব্র লড়াই চলছে। সেখানে মিয়ানমার বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও সেনাদের পক্ষত্যাগের খবর পাওয়া যাচ্ছে। আরাকান আর্মির যোদ্ধারা রাখাইন রাজ্যের রাজধানী সিত্তেকেও ঘিরে ফেলেছে। সিত্তে বর্তমানে রাখাইনের মাত্র তিনটি শহরের একটি, যেগুলো এখননো মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

এদিকে রাখাইনের বাইরে আরাকান আর্মির অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সামরিক বাহিনী পার্শ্ববর্তী ম্যাগওয়ে, বাগো ও আয়েয়ারওয়াদি অঞ্চলে হাজার হাজার অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করেছে।