গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বৈষম্যহীন ও মুক্ত শিক্ষাঙ্গনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম।
শনিবার (১৬ মে) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।
নিচে তার ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো:
শনিবার (১৬ মে) সকালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের আয়োজনে অভ্যুত্থান উত্তর বাংলাদেশে শিক্ষাঙ্গনগুলোর সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এই গোলটেবিল বৈঠকে দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে চিত্র উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ৫ই আগস্টের পর আমরা যে বৈষম্যহীন ক্যাম্পাসের স্বপ্ন দেখেছিলাম, বাস্তব চিত্র তার উল্টো।
শনিবার (১৬ মে) তার ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান সংকটের মূল দিকগুলো:
১. নতুন মোড়কে দখলদারিত্ব: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সিট সংকটকে পুঁজি করে শিক্ষার্থীদের জিম্মি করার পুরনো সংস্কৃতি এখনো বহাল। আগে যেখানে শারীরিক নিপীড়ন চলত, এখন সেখানে মানসিক নিপীড়ন ও আইসোলেশনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা মানতে বাধ্য করা হচ্ছে।
২. সাধারণ শিক্ষার্থী' পরিচয়ে প্রভাব বিস্তার: খুলনা ও কুয়েটসহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে 'সাধারণ শিক্ষার্থী' বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আড়ালে মুষ্টিমেয় কিছু গোষ্ঠী প্রভাব বিস্তার করছে। এমনকি অনলাইন 'মব' তৈরি করে ফিজিক্যাল স্পেসে অস্থিরতা তৈরির প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
৩. বিচারহীনতা ও প্রশাসনের ভূমিকা: জাহাঙ্গীরনগর ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রক্টরিয়াল বডির নীরবতা বা পক্ষপাতিত্ব অপরাধীদের সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের খুনের বিচার চাইতে গেলে নারী শিক্ষার্থীদের প্রতি প্রশাসনের শিক্ষকদের অশ্রাব্য মন্তব্য ও কটূক্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
৪. শিক্ষকদের ওপর নিপীড়ন ও মিথ্যা মামলা: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষকদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হচ্ছে। অন্তত ১৪-১৫ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছে, যার ফলে তাঁরা ক্যাম্পাসে ফিরতে পারছেন না। অনেক জায়গায় শিক্ষকদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করার অভিযোগও উঠেছে।
৫. সাংস্কৃতিক দমন ও ট্যাগিং: প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় শিক্ষকদের 'ইসলাম বিরোধী' ট্যাগ দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই চাকরিচ্যুত করা হচ্ছে।
এই প্রেক্ষিতে আমাদের দাবি:
(১) শিক্ষকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা সকল মিথ্যা ও ভিত্তিহীন হত্যা মামলা অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে;
(২) হলগুলোতে সিট সংকট সমাধান করে প্রশাসনিকভাবে সিট বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে; কোনো রাজনৈতিক শক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে দখলদারিত্ব ছেড়ে দেওয়া যাবে না;
(৩) ক্যাম্পাসে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে এবং 'ট্যাগিং' বা 'মব জাস্টিস' বন্ধ করতে হবে;
(৪) অপরাধীদের আশ্রয়দাতা এবং পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় হোক মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর দখলদারিত্বের চারণভূমি নয়।
লেখক: গবেষক ও শিক্ষক, উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।


