গোলাম যাকারিয়া

 

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক স্পর্শকাতর এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। সম্প্রতি ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং নতুন সংসদের কাছে প্রত্যাশা’ শীর্ষক সংলাপে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ একটি অপ্রিয় কিন্তু রূঢ় বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন। তার মন্তব্য- ‘রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা ধরে রাখতে পার্বত্য চট্টগ্রামে ১০০ শতাংশ মানবাধিকার নিশ্চিত করা যাবে না’-মূলধারার সংলাপে বিতর্কের সৃষ্টি করতে পারে, তবে ভূ-রাজনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার লেন্স দিয়ে দেখলে এটি একটি গভীর সত্য। এই বক্তব্য কোনো গোষ্ঠী বা অঞ্চলের মানুষের প্রতি বিদ্বেষ থেকে নয়, বরং রাষ্ট্রের অস্তিত্ব রক্ষার অনিবার্য তাগিদ থেকে উৎসারিত।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা- রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং বান্দরবান তিনটি দেশের (বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমার) সীমান্ত সংলগ্ন। এই ভৌগোলিক অবস্থান অঞ্চলটিকে যেমন বৈচিত্র্যময় করেছে, তেমনি করেছে ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যখন কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সক্রিয় থাকে, তখন সেখানে স্বাভাবিক সিভিলিয়ান আইন দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে কয়েক দশক ধরে চলে আসা অস্থিতিশীলতা এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতার জন্য সরাসরি হুমকি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের মূল সুরটি এখানেই- যদি সামরিক বা নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রতিটি পদক্ষেপে শতভাগ মানবাধিকারের মানদণ্ড (যা সাধারণত শান্তির সময়ে স্বাভাবিক এলাকায় প্রযোজ্য) বজায় রাখতে বাধ্য করা হয়, তবে তাদের হাত কার্যত বেঁধে দেওয়া হবে। এতে রাষ্ট্রবিরোধী শক্তির ডালপালা বিস্তার করার সুযোগ বেড়ে যায়।

পার্বত্য অঞ্চলে বর্তমানে বেশ কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী চাঁদাবাজি, অপহরণ এবং অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি চালিয়ে যাচ্ছে। ইউপিডিএফ (প্রসীত), ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), জেএসএস, কেএনএফের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উত্থান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, পাহাড়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি কতটা নাজুক হতে পারে। যখন কোনো গোষ্ঠী রাষ্ট্রের ভেতরে নিজস্ব ‘স্বায়ত্তশাসন’ বা ‘বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্র’ গঠনের স্বপ্ন দেখে এবং অস্ত্র হাতে তুলে নেয়, তখন সেটি আর সাধারণ অপরাধের পর্যায়ে থাকে না; সেটি সরাসরি সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন, “এখানে যদি আমরা ১০০ শতাংশ হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনের বিষয়টা নজরে নিয়ে আসি, তাহলে আমাদের ডিফেন্স ফোর্সকে অনেক কিছু প্রয়োগ করতে দিতে পারব না।” যুদ্ধের ময়দানে বা কাউন্টার-ইনসারজেন্সি অপারেশনে সামরিক বাহিনীকে কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যদি প্রতি মুহূর্তে তাদের ওপর মানবাধিকারের কঠোর আইনি খড়গ ঝুলিয়ে রাখা হয়, তবে তারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কুন্ঠাবোধ করবে। উদাহরণস্বরূপ, যখন সন্ত্রাসীরা কোনো লোকালয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে আক্রমণ চালায়, তখন আত্মরক্ষার্থে বা দেশ রক্ষার্থে নেওয়া কঠোর পদক্ষেপগুলো অনেক সময় তথাকথিত মানবাধিকারের সংজ্ঞায় ‘লঙ্ঘন’ হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থে সেই ঝুঁকি নিতেই হয়।

মানবাধিকার কোনো বিচ্ছিন্ন ধারণা নয়। মানুষের বাঁচার অধিকার বা জীবনের নিরাপত্তা তখনই নিশ্চিত হয় যখন রাষ্ট্র টিকে থাকে। রাষ্ট্রই যদি অখণ্ড না থাকে, তবে সেখানে মানবাধিকার রক্ষা করবে কে? সিরিয়া, লিবিয়া বা ইয়েমেনের দিকে তাকালে দেখা যায়, যখন কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা দুর্বল হয়েছে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মাথাচাড়া দিয়েছে, তখন মানবাধিকার বলে কিছু অবশিষ্ট থাকেনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে নেতিবাচকভাবে না দেখে একে একটি ‘প্র্যাগম্যাটিক অ্যাপ্রোচ’ বা বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে দেখা উচিত। তিনি বলতে চেয়েছেন:

সার্বভৌমত্ব সবার আগে: রাষ্ট্র না থাকলে নাগরিক অধিকার অর্থহীন।

জাতীয় নিরাপত্তা: পার্বত্য অঞ্চলে যা চলছে তা কোনো সাধারণ আইন-শৃঙ্খলার অবনতি নয়। এখানে সাধারণ মানবাধিকারের সংজ্ঞাকে শিথিল করে জাতীয় নিরাপত্তাকে প্রাধান্য দেওয়া জরুরি।

হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা: সন্ত্রাস দমনে নিরাপত্তা বাহিনীকে কিছু বিশেষ ক্ষমতা দিতে হয়। যদি মানবাধিকার কমিশন সেখানে ১০০ শতাংশ নজরদারি চালায়, তবে গোয়েন্দা তৎপরতা ও অপারেশনাল গোপনীয়তা বজায় রাখা অসম্ভব হবে।

অনেকে এই বক্তব্যকে পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের প্রতি বৈষম্য হিসেবে দেখতে পারেন। কিন্তু বিষয়টি আসলে বিপরীত। পাহাড়ের সাধারণ অবাঙালি বা বাঙালি নাগরিকরা সন্ত্রাসীদের হাতে জিম্মি থাকে। চাঁদাবাজি আর অস্ত্রের ভয়ে তারা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে না। নিরাপত্তা বাহিনী যখন কঠোর হয়, তখন মূলত এই সাধারণ মানুষের শান্তিই নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বলেন এটি ‘থ্রেট’ হয়ে যাবে, তখন তিনি রাষ্ট্রের নিরাপত্তার পাশাপাশি ওই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার কথাই বুঝিয়েছেন।

বিশ্বের অনেক দেশেই এমন আইন রয়েছে। যেমন ভারতের 'AFSPA' (Armed Forces Special Powers Act) বিতর্কিত হলেও সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর অখণ্ডতা রক্ষায় দীর্ঘকাল ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে কার্যকর রাখতে হলে তাদের কিছুটা অপারেশনাল স্বাধীনতা প্রদান করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।

পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তির পর অনেক বছর কেটে গেলেও শান্তি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ কমেনি। বর্তমানে ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাইরের শক্তির উস্কানিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই পরিস্থিতিতে যদি মানবাধিকারের ধুয়া তুলে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া হয়, তবে পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্র হারিয়ে ফেলতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মন্তব্যটি মূলত এই গভীর আশঙ্কারই প্রতিফলন। তিনি সত্যটি অকপটে স্বীকার করেছেন- যা একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার পরিচয়।

রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো রোমান্টিক বা আদর্শিক প্রকল্প নয়; এটি কঠিন বাস্তবের ওপর দাঁড়িয়ে নেওয়া সিদ্ধান্তের সমষ্টি। পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই অখণ্ডতা রক্ষা করতে গেলে কঠোর কিছু সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ যে মন্তব্য করেছেন, তা মূলত বাস্তবতার একটি সাহসী স্বীকারোক্তি। শতভাগ মানবাধিকার নিশ্চিত করার দোহাই দিয়ে যদি রাষ্ট্রকেই হুমকির মুখে ফেলা হয়, তবে সেই মানবাধিকার কার কল্যাণে আসবে?

কাজেই, পার্বত্য অঞ্চলের বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা রক্ষা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর আরোপিত আইনি কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল রাখা এবং জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া বর্তমান সময়ের দাবি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বাস্তবসম্মত অবস্থান পাহাড় ও সমতলের সকল নাগরিকের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তার স্বার্থেই অত্যন্ত জরুরি।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক