গোলাম যাকারিয়া
যেকোনো অঞ্চলে অ-লাভজনক বেসরকারি সংস্থা বা এনজিও -কে সাধারণত মানবিকতা, উন্নয়ন ও সেবার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ক্ষুদ্রঋণ বা স্যানিটেশন- এনজিওর কার্যক্রমের এই চেনা রূপের আড়ালে তাদের আরও একটি শক্তিশালী, অথচ কম আলোচিত, ভূমিকা রয়েছে। সেটি হলো- একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর চিন্তা-ভাবনা, বিশ্বাস ও সামাজিক ‘ন্যারেটিভ’ বা আখ্যান পরিবর্তন করে দেওয়া। এটি এক নীরব অথচ অত্যন্ত প্রভাবশালী ‘সফট পাওয়ার’-এর অনুশীলন।
এই তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের পর যখন আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো একটি ভূ-রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল, জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় এবং ঐতিহাসিক সংঘাতের ইতিহাস সম্বলিত অঞ্চলে এনজিওগুলোর ভূমিকাকে বিশ্লেষণ করি, তখন বিষয়টি আর কেবল ‘উন্নয়ন’ বা ‘সেবা’র মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত হয়ে ওঠে।
এনজিওর ন্যারেটিভ পরিবর্তনের প্রক্রিয়াটি সাধারণত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। শুরুতে, এনজিওগুলো কোনো এলাকায় প্রবেশ করে অপরিহার্য সেবা (যেমন- বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা) প্রদানের মাধ্যমে। এই মানবিক কাজগুলো তাদের স্থানীয় জনগণের মধ্যে গভীর বিশ্বাস ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করে দেয়, যা পরবর্তীকালে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার ‘সামাজিক লাইসেন্স’ হিসেবে কাজ করে। এই বিশ্বাস অর্জনের পর, এনজিওগুলো স্থানীয় সমস্যাগুলোকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত বা ‘ফ্রেম’ করতে শুরু করে। উদাহরণস্বরূপ, একটি সনাতনী সমাজে বিদ্যমান প্রথাকে তারা ‘ঐতিহ্য’ না বলে ‘কুসংস্কার’ বা ‘নারীর প্রতি নিপীড়ন’ হিসেবে তুলে ধরতে পারে। দারিদ্র্যকে ‘অদৃষ্ট’ না বলে, তাকে ‘রাষ্ট্রীয় বৈষম্য’ বা ‘কাঠামোগত শোষণ’ (Structural Exploitation) হিসেবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
তবে, এনজিওগুলো সাধারণত সরাসরি নিজেরা কথা বলে না। বরং তারা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে- বিশেষত তরুণ, শিক্ষিত ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিদের বাছাই করে। কর্মশালা, সেমিনার এবং ফেলোশিপের মাধ্যমে তাদের এই নতুন ‘বয়ান’ বা ‘দৃষ্টিভঙ্গি’ দিয়ে প্রশিক্ষিত করা হয়। দিনশেষে, এই প্রশিক্ষিত স্থানীয়রাই ‘সিভিল সোসাইটি’ বা ‘কমিউনিটি লিডার’ হিসেবে সমাজে এনজিওর কাঙ্ক্ষিত ন্যারেটিভটি ছড়িয়ে দেয়।
এর পাশাপাশি, এনজিওর হাতে থাকা সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো ‘ফান্ড’ বা অর্থ। প্রকৃতপক্ষে, তারা সেই সব স্থানীয় উদ্যোগ, সংগঠন বা ব্যক্তিকে অর্থায়ন করে, যারা তাদের ‘ন্যারেটিভ’ বা ‘এজেন্ডা’র সাথে একমত পোষণ করে। ফলে যে গোষ্ঠী এনজিওর মতাদর্শ গ্রহণ করে, তারা অনুদান পায়; আর যারা বিরোধিতা করে, তারা ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এভাবে একটি নির্দিষ্ট চিন্তাধারা অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়ে ওঠে। এবং চূড়ান্ত ধাপে, এই প্রশিক্ষিত স্থানীয় কর্মী এবং অর্থায়নপুষ্ট সংগঠনগুলোর মাধ্যমে এনজিওগুলো রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ‘অ্যাডভোকেসি’ শুরু করে। তারা নির্দিষ্ট বিষয়ে গবেষণা, রিপোর্ট প্রকাশ এবং গণমাধ্যমে ব্রিফিং করে একটি বিষয়কে ‘জাতীয় সমস্যা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যা হয়তো আগে আলোচনারই অংশ ছিল না।
উপরোক্ত তাত্ত্বিক কাঠামোটি পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো একটি জটিল অঞ্চলে প্রয়োগ করলে, এর প্রভাব এবং অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে এনজিওগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
উদাহরণস্বরূপ, পার্বত্য চট্টগ্রামে এনজিওগুলোর কার্যক্রমের একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে ‘আদিবাসী’ পরিচয়ের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বা ‘উপজাতি’ হিসেবে পরিচিত জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ (Indigenous) হিসেবে ব্র্যান্ডিং করার একটি জোরালো ও দীর্ঘমেয়াদী প্রকল্প চলমান। এই ন্যারেটিভ পরিবর্তনের মাধ্যমে তারা সমস্যাটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জাতিগত বৈচিত্র্যের বিষয় না রেখে, এটিকে জাতিসংঘের ‘আদিবাসী অধিকার চার্টার’ (UNDRIP)-এর অধীনে একটি আন্তর্জাতিক ইস্যুতে পরিণত করতে চায়। এর ফলে ভূমির ওপর রাষ্ট্রের অধিকার এবং সংবিধানের সার্বভৌমত্ব সরাসরি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে।
একইসাথে, অনেক এনজিওর কার্যক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী সকল জনগোষ্ঠীর (বাঙালি-অবাঙালি) মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের বদলে, একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে ‘ভূমিপুত্র’ এবং অন্য জনগোষ্ঠীকে ‘বহিরাগত সেটলার’ হিসেবে চিত্রিত করার প্রবণতা দেখা যায়। এই ন্যারেটিভ দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐতিহাসিক সহাবস্থানের বদলে জাতিগত বিভাজন, অবিশ্বাস এবং ঘৃণা তৈরি করে, যা সামাজিক অস্থিরতার একটি প্রধান কারণ। সর্বোপরি, কিছু এনজিওর অর্থায়নে পরিচালিত গবেষণা ও প্রচারে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সমস্যার জন্য একতরফাভাবে রাষ্ট্র, সংবিধান এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে (বিশেষ করে সেনাবাহিনীকে) দায়ী করা হয়। একটি ‘রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন’ ও ‘ভিকটিম’ ন্যারেটিভ তৈরি করা হয়, যেখানে স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর চাঁদাবাজি, গুম, খুন এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে হয় এড়িয়ে যাওয়া হয়, অথবা সেগুলোকে ‘রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে এনজিওর পরোক্ষ ভূমিকাও কম নয়। একটি বড় উদাহরণ হলো ‘ডি-মিলিটারাইজেশন’ বা অসামরিকীকরণের একপেশে প্রচারণা। পার্বত্য চট্টগ্রামে এনজিও এবং তাদের সৃষ্ট সিভিল সোসাইটির একটি প্রধান দাবি হলো ‘অসামরিকীকরণ’ বা সেনাবাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার। আপাতদৃষ্টিতে এই দাবিটি শান্তির পক্ষে মনে হলেও, এর একটি পরোক্ষ ও বিপজ্জনক দিক রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি ত্রি-দেশীয় (বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমার) সীমান্তবর্তী স্পর্শকাতর এলাকা এবং এটি বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের চারণভূমি।
যখন এনজিওগুলো শুধু রাষ্ট্রকে সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেয়, কিন্তু সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (যেমন ইউপিডিএফ, জেএসএস, কেএনএফ) নিরস্ত্র করার বিষয়ে নীরব থাকে, তখন তারা পরোক্ষভাবে একটি ‘নিরাপত্তা শূন্যতা’ (Security Vacuum) তৈরি করতে চায়। এই শূন্যতা রাষ্ট্রকে দুর্বল করে এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের আধিপত্য বিস্তারের সুযোগ করে দেয়, যা অস্থিতিশীলতাকে আরও বৃদ্ধি করে।
তদুপরি, কিছু আন্তর্জাতিক এনজিও পার্বত্য চট্টগ্রামে তাদের কার্যক্রম এমনভাবে পরিচালনা করে, যা প্রায়শই একটি ‘সমান্তরাল প্রশাসন’ তৈরির চেষ্টা বলে প্রতীয়মান হয়। তারা রাষ্ট্র বা স্থানীয় সরকারের সাথে সমন্বয়ের বদলে, সরাসরি তাদের নিজস্ব ‘এজেন্ট’ বা ‘পার্টনার’দের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। এর ফলে রাষ্ট্র ব্যবস্থা দুর্বল হয় এবং রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্ণ হয়।
মূলত, এনজিওগুলো কোনো শূন্যতায় কাজ করে না। তাদের অর্থায়ন আসে নির্দিষ্ট দাতা দেশ বা সংস্থার কাছ থেকে, যাদের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ থাকে। পার্বত্য চট্টগ্রাম, মিয়ানমারের রাখাইন ও ভারতের সেভেন সিস্টার্সের সংযোগস্থলে হওয়ায়, এটি বৈশ্বিক পরাশক্তিদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে, এই অঞ্চলে কর্মরত এনজিওগুলো অনেক সময় তাদের দাতাদের ‘সফট পাওয়ার টুলস’ বা ‘এজেন্ট’ হিসেবে কাজ করে। তাদের ছড়ানো ন্যারেটিভ হয়তো বাংলাদেশের স্বার্থের পক্ষে নয়, বরং তা দাতাদের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে অস্থিতিশীলতা জিইয়ে রাখতে সহায়তা করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে এনজিওর ভূমিকা একটি ‘ডাবল-এজড সোর্ড’ বা দ্বি-ধারী তলোয়ার। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে তাদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু যখন এই সেবামূলক কাজের আড়ালে একটি অঞ্চলের মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক ন্যারেটিভ পরিবর্তনের সুগঠিত প্রকল্প চালানো হয়, তখন বিষয়টি জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগে পরিণত হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে এনজিওর সরাসরি হাত না থাকলেও, তাদের ছড়ানো ‘বিভাজনের ন্যারেটিভ’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী বয়ান’ এবং ‘অসামরিকীকরণের’ একপেশে দাবি এই অঞ্চলের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে পরোক্ষভাবে সুবিধা করে দিচ্ছে এবং অস্থিতিশীলতার আগুনকে নিভতে দিচ্ছে না। তাই, পার্বত্য চট্টগ্রামে এনজিওগুলোর কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, তাদের অর্থায়নের উৎস এবং তাদের প্রকৃত ‘এজেন্ডা’ পর্যবেক্ষণ এখন সময়ের দাবি।
লেখক- সাংবাদিক ও কলামিস্ট

