গোলাম যাকারিয়া
২০১৭ সালের সেই বিভীষিকাময় আগস্টের কথা কি বিশ্ববাসী আজ মনে রেখেছে? যখন নাফ নদীর জল রক্তাক্ত করে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পৈশাচিক উল্লাস আর অগ্নিসংযোগ থেকে বাঁচতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল। সেই সময় বিশ্ববিবেকের দরজায় কড়া নেড়েছিল এই ‘জেনোসাইড’ বা গণহত্যা। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে বড় বড় পরাশক্তি- সবার মুখে ছিল অভিন্ন বুলি: "রোহিঙ্গাদের দ্রুত নিরাপদ ও সসম্মান প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।" কিন্তু আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে সেই প্রতিশ্রুতির কঙ্কালসার চেহারাটাই কেবল দৃশ্যমান। নির্মম সত্য এই যে, বিশ্ব রাজনীতিতে এখন নতুন নতুন ‘ইস্যু’ এসেছে, আর রোহিঙ্গারা নিক্ষিপ্ত হয়েছে ইতিহাসের এক অন্ধকার গহ্বরে।
বিশ্ব রাজনীতিতে সংহতির আয়ু খুব ছোট। ২০১৭ সালে যখন রোহিঙ্গা সংকট শুরু হয়, তখন এটি ছিল বিশ্বের এক নম্বর মানবিক ইস্যু। কিন্তু এরপর সময় যত গড়িয়েছে, বিশ্বের নজর তত অন্যদিকে ঘুরেছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ ইউরোপের নিরাপত্তাকে নাড়িয়ে দিল। এরপর মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইসরায়েল-গাজা সংঘাতের তীব্রতা বৃদ্ধি পেল, যা মানবিকতার সব সীমা ছাড়িয়ে গেল। এরপর সুদানের গৃহযুদ্ধ এবং সর্বশেষ ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইরানের সরাসরি সংঘাতের ডামাডোলে বিশ্ব গণমাধ্যম ও নীতিনির্ধারকদের টেবিল থেকে রোহিঙ্গা ফাইলটি ধুলোবালিমাখা অবস্থায় এক কোণে পড়ে আছে।
বিশ্ব এখন নতুন নতুন ‘ব্রেকিং নিউজ’ নিয়ে মেতে আছে। গাজায় যা ঘটছে তা নিঃসন্দেহে অমানবিক, ইউক্রেনে যা হচ্ছে তা বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণ বদলে দিচ্ছে, কিন্তু তার মানে কি এই যে- রোহিঙ্গাদের ওপর হওয়া সেই জঘন্যতম গণহত্যার বিচার বা তাদের বেঁচে থাকার অধিকার কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ? দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহের কেন্দ্রে এখন আর রোহিঙ্গা নেই। তারা এখন ব্যস্ত ইরানের মিসাইল আর ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়ে। আর এই সুযোগে মিয়ানমার জান্তা এবং আরাকান আর্মির হাতে রোহিঙ্গারা প্রতিদিন নতুন করে পিষ্ট হচ্ছে।
রোহিঙ্গারা আজ কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, ঐতিহাসিকভাবেও এক চরম সংকটের মুখে। বিগত কয়েক বছর ধরেই রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আন্তর্জাতিক অনুদান আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) বারবার তাদের রেশনের বরাদ্দ কমাতে বাধ্য হচ্ছে। ইউক্রেন বা গাজার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের সহায়তা তহবিল গঠন করা হলেও, রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল সংগ্রহের গ্রাফটি নিচের দিকে নামছে।
এরকম একটি আশ্রয় শিবিরে যখন মানুষ তার নূন্যতম খাবারের নিশ্চয়তা পায় না, তখন সেখানে অস্থিরতা বাড়াই স্বাভাবিক। অনুদান সংকটের ফলে ক্যাম্পে বাড়ছে অপরাধ, মানবপাচার আর মাদক কারবার। যুব ও স্বপ্নবাজ একটি প্রজন্ম আজ কেবল রেশনের চাল-ডালের লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের পরিচয় হারিয়ে ফেলছে। বিশ্ববাসী ভুলে গেছে যে, একটি জাতিকে এভাবে বছরের পর বছর ক্যাম্পে বন্দি রেখে তাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেওয়াও এক প্রকার ধীরগতির গণহত্যা।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের স্বপ্ন আজ সবচেয়ে বেশি ফিকে হয়ে আসছে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতার কারণে। সামরিক জান্তা বনাম আরাকান আর্মি এবং অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর লড়াইয়ে রাখাইন এখন এক রণক্ষেত্র। প্রত্যাবাসনের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেই শোনানো হয় ‘অস্থিরতার’ অজুহাত। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, আরাকান আর্মিও রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে এবং তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে। অর্থাৎ, নিজ দেশে ফেরার যে স্বপ্ন নিয়ে রোহিঙ্গারা নাফ নদীর ওপারে তাকিয়ে ছিল, সেই পথ এখন আরও কণ্টকাকীর্ণ।
বাংলাদেশ মানবিকতার খাতিরে প্রায় দেড় মিলিয়ন রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছিল। কিন্তু আজ বাংলাদেশ নিজেই এক কঠিন অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সম্মুখীন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা ও উদাসীনতা বাংলাদেশকে এক অসহনীয় চাপের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পাহাড়ের বনভূমি উজাড় হওয়া, স্থানীয় জনগণের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং নিরাপত্তার ঝুঁকি- সব মিলিয়ে বাংলাদেশ এখন এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটে বন্দি। বিশ্ব যখন নতুন ইস্যুতে মেতে থাকে, তখন তার চরম মূল্য দিতে হয় আশ্রয়দাতা দেশটিকে।
রোহিঙ্গাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি কারণ বিশ্বের কাছে তারা এখন একটি ‘পুরানো ইস্যু’। কিন্তু মনে রাখা দরকার, মানবাধিকারের কোনো মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ থাকে না। আজ ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বা ইউক্রেন সংকটকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের ভুলে যাওয়া মানে হলো মিয়ানমারের সেই খুনি জান্তাকে মুক্তি দেওয়া।
যদি বিশ্ববাসী আজ রোহিঙ্গাদের ভুলে যায়, তবে ভবিষ্যতে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। প্রত্যাবাসন কেবল একটি রাজনৈতিক শব্দ নয়, এটি একটি জাতির বেঁচে থাকার অধিকার। বিশ্ব নেতাদের আয়নার সামনে দাঁড়ানোর সময় এসেছে- তারা কি কেবল শক্তির রাজনীতিতে বিশ্বাসী, নাকি এখনো তাদের হৃদয়ে মানবিকতার কোনো অবশিষ্ট আছে? রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ আর কত ভয়ঙ্কর হবে, তা নির্ভর করছে এই বিস্মৃতির দেয়াল আমরা কত দ্রুত ভাঙতে পারি তার ওপর।
ইস্যু আসবে, ইস্যু যাবে- কিন্তু লাখ লাখ মানুষের জীবন নিয়ে এই তামাশা বন্ধ হওয়া দরকার। রোহিঙ্গাদের যেন কেবল ‘ফেলে আসা গল্পের’ মতো মনে না করা হয়; বরং তাদের প্রাপ্য বিচার ও জন্মভূমিতে ফেরার অধিকারটুকু যেন বিশ্ব এজেন্ডার শীর্ষে ফিরে আসে। নতুবা, এই মানবিক বিপর্যয় বিশ্বের জন্য এক স্থায়ী কলঙ্ক হয়ে থাকবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

