মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে ব্যাপক ঘৃণাপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টি খুঁজে পেয়েছে এএফপির ফ্যাক্ট চেক বিভাগ। মানবাধিকার সংগঠন ও বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এসব অপতথ্য রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, বৈষম্য ও ভয়ভীতি আরও বাড়িয়ে তুলছে।

এএফপির ফ্যাক্ট চেকাররা জানিয়েছেন, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে রোহিঙ্গাদের নিয়ে ভুয়া উদ্ধৃতি, বিকৃত ভিডিও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি ছবি এবং মনগড়া পরিসংখ্যান ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। এসব দাবির অনেকগুলোই যাচাই করে মিথ্যা বা ভিত্তিহীন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর সামরিক নিপীড়ন ও সংকটের সময় থেকেই তাদের নিয়ে অপপ্রচার চলে আসছে। তবে আগামী বছরের মালয়েশিয়ার নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ধরনের রাজনৈতিক বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা নতুন করে বেড়েছে।

মিয়ানমারবিষয়ক মালয়েশিয়ান অ্যাডভাইজরি গ্রুপের সেক্রেটারিয়েট প্রধান লিলিয়ান ফ্যান বলেন, অর্থনীতি, অভিবাসন, জনসেবা, নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর মাধ্যমে ব্যবহার করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা এমন একটি মাধ্যমে পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে অর্থনীতি, অভিবাসন, জনসেবা, নিরাপত্তা ও জাতীয় পরিচয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগ সবচেয়ে আক্রমণাত্মক ও ঘৃণামূলক ভাষায় প্রকাশ করা হচ্ছে।’

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) অনুযায়ী, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় দুই লাখ ১৫ হাজারের বেশি আশ্রয়প্রার্থী ও অভিবাসী অবস্থান করছেন। এর মধ্যে প্রায় এক লাখ ২৬ হাজার রোহিঙ্গা, যা দেশটির সবচেয়ে বড় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।

রোহিঙ্গাবিরোধী মনোভাব নতুন করে তীব্র হয় গত মে মাসের শেষ দিকে। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ ছড়ানো হয়, ঈদুল আজহার সময় কোরবানির বর্জ্য ফেলে রোহিঙ্গারা পরিবেশ নষ্ট করেছে। এ ঘটনায় রোহিঙ্গাদের অন্য দেশে পাঠানোর দাবিতে একটি অনলাইন আবেদন চালু হয়, যাতে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের সমর্থন পাওয়ার পর তা সরিয়ে নেওয়া হয়।

মালয়েশিয়ার মানবাধিকার কমিশন গত মাসে এক বিবৃতিতে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বাড়তে থাকা বিদ্বেষ, বৈষম্যমূলক বক্তব্য ও অনলাইন হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।

এএফপির ফ্যাক্ট চেকে আরও বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন গুজব ছড়ানো হচ্ছে যে রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়ায় নিজেদের জন্য আলাদা ভূখণ্ড ও বিশেষ অধিকার আদায়ের চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে তারা মালয়েশীয় নাগরিকদের বিয়ে করে নাগরিকত্ব পাওয়ার পরিকল্পনা করছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।

‘রোহিঙ্গা মালয়েশিয়া’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপের পোস্টে দাবি করা হয়, স্থানীয় রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়ার একটি শহর তাদের কাছে হস্তান্তরের আহ্বান জানিয়েছে। তবে এএফপির ফ্যাক্ট-চেকাররা অনুসন্ধানে দেখেছেন, কয়েক হাজার প্রতিক্রিয়া পাওয়া ওই পোস্টটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি। বাস্তবে ওই নামে কোনো সক্রিয় সংগঠনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

এছাড়া ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টের স্ক্রিনশটে দেখা যায়, বিশেষ পোশাক পরা এক ব্যক্তি মালয়েশিয়ার ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরা আরেক ব্যক্তিকে লাথি মারছেন। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘রোহিঙ্গারা মালয়েশীয়দের লাথি মেরে বের করে দিচ্ছে।’ এএফপির অনুসন্ধানে জানা যায়, পোস্টটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয়েছিল। পরে ওই অ্যাকাউন্টের মালিক ছবিটিকে ভুয়া বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং এমন কোনো পোস্ট দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন।

এএফপির ফ্যাক্ট চেকে আরও উঠে এসেছে, কয়েকটি পোস্টে দাবি করা হয়েছিল যে মালয় ও রোহিঙ্গা দম্পতিদের ঘরে ২০ লাখ শিশু জন্ম নিয়েছে। সরকারি তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের মতামত অনুযায়ী, এ দাবির কোনো ভিত্তি নেই। বিশ্লেষকেরা এটিকে ‘অসম্ভব’ বলে মন্তব্য করেছেন।

লিলিয়ান ফ্যান বলেন, ‘তথ্যের নির্ভুলতার চেয়ে অ্যালগরিদমগুলো মানুষের ক্ষোভকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এর ফলে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনাকেও পুরো রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।’

ফ্রান্সভিত্তিক তথ্য-অখণ্ডতা বিশ্লেষক ভিকতোয়ার রিও বলেন, রোহিঙ্গাবিরোধী পোস্ট ছড়ানো অনেক অ্যাকাউন্টই ফেসবুকের ‘পার্টনার পাবলিশার’ হিসেবে অর্থ আয় করেছে।

তিনি বলেন, আর্থিক লাভের উদ্দেশ্যে পরিচালিত এসব কার্যক্রম প্রায়ই রোহিঙ্গা সংকটের মতো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর ইস্যুকে ব্যবহার করে। কারণ, এ ধরনের বিষয় সমাজে বিভাজন তৈরি করে এবং কৃত্রিমভাবে মানুষের মনোযোগ ও প্রতিক্রিয়া বাড়ানোর জন্য উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে।

রোহিঙ্গা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, অনলাইন বিদ্বেষ বাড়ায় অনেক রোহিঙ্গা নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ বা সহায়তা চাইতেও ভয় পাচ্ছেন। তারা আশঙ্কা করছেন, এতে তারা অনলাইন হয়রানি ও জনরোষের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারেন।

মালয়েশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় রোহিঙ্গা আশ্রয়দাতা দেশ হলেও দেশটি ১৯৫১ সালের শরণার্থী কনভেনশনে সই করেনি এবং সেখানে রোহিঙ্গাদের কোনো আনুষ্ঠানিক আইনি স্বীকৃতি নেই।

রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর দাবির বিষয়ে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুতিওন বলেছেন, সরকার নিরাপত্তা ও মানবিক বিষয় বিবেচনায় রেখে অন্যান্য দেশের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে।

প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে আসিয়ানের মাধ্যমে আলোচনা চালিয়ে যাবে মালয়েশিয়া। পাশাপাশি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সংকট সমাধানে যৌথভাবে কাজ করার কথাও জানিয়েছেন তিনি।