আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা (আইএমও) অনুমোদিত জাহাজ পুনর্ব্যবহার ইয়ার্ডের সংখ্যায় বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। হংকং কনভেনশনের আওতায় আইএমও’র প্রকাশিত বৈশ্বিক তালিকায় বাংলাদেশের ১৭টি জাহাজ পুনর্ব্যবহার ইয়ার্ড স্থান পেয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে সমালোচিত জাহাজভাঙা শিল্পকে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ খাতে রূপান্তরের প্রচেষ্টার ফল হিসেবে এই স্বীকৃতিকে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। পরিবেশ সুরক্ষা, শ্রমিক নিরাপত্তা ও আধুনিক পুনর্ব্যবহার অবকাঠামোয় বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই অবস্থানে পৌঁছেছে।
আইএমও’র তালিকা অনুযায়ী, ১৮টি অনুমোদিত ইয়ার্ড নিয়ে শীর্ষে রয়েছে তুরস্ক। বাংলাদেশ ১৭টি ইয়ার্ড নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। জাপান ও নরওয়ের রয়েছে সাতটি করে অনুমোদিত ইয়ার্ড, ডেনমার্কের পাঁচটি, স্পেনের দুটি এবং জার্মানি ও বেলজিয়ামের একটি করে ইয়ার্ড রয়েছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভারত ও পাকিস্তানের কোনো ইয়ার্ড এই তালিকায় স্থান পায়নি।
সীতাকুণ্ড এখন ‘গ্রিন রিসাইক্লিং’ হাব
আইএমও’র ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রকাশিত নথি অনুযায়ী, অনুমোদিত ১৭টি ইয়ার্ডই চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড শিল্পাঞ্চলে অবস্থিত। এগুলো বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেয়েছে, যার মেয়াদ ২০৩০ সালের ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত।
অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে—পিএইচপি শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, কবির স্টিল লিমিটেড, এসএন করপোরেশনের তিনটি ইউনিট, কেআর শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড, আরব শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং লিমিটেড, এইচএম শিপিং লাইনস লিমিটেড, ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজ, এনবি স্টিল, এমএকে করপোরেশন, কেআর স্টিল লিমিটেড, যমুনা শিপ ব্রেকার্স, জনতা স্টিল লিমিটেড, তাহের অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড, বব রিসাইক্লার্স এবং আসাদী স্টিল এন্টারপ্রাইজ।
বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ডের মহাপরিচালক শফিউল আলম তালুকদার বলেন, ‘হংকং কনভেনশনের আওতায় অনুগত ইয়ার্ডগুলোকে ডিএএসআর সনদ দিয়ে গত বছরের নভেম্বরে আমরা আইএমও’র কাছে তালিকা পাঠাই। বাংলাদেশ প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি যারা এই তালিকা জমা দিয়েছে।’
তিনি জানান, বর্তমানে দেশে ৩০টি গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ড রয়েছে, যার মধ্যে চারটি শর্তসাপেক্ষ অনুমোদনে পরিচালিত হচ্ছে। আগামী জুনে নতুন তালিকা হালনাগাদ করা হবে এবং তখন বাংলাদেশ বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
আধুনিকায়নে ২ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ
২০২৫ সালের ২৬ জুন হংকং কনভেনশন কার্যকর হওয়ার পর নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনর্ব্যবহার আন্তর্জাতিকভাবে বাধ্যতামূলক মানদণ্ডে পরিণত হয়।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক মান পূরণে গত দুই বছরে ইয়ার্ড মালিকরা ২ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে অপরিবাহী মেঝে, বর্জ্য শোধনাগার, শ্রমিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং পরিবেশ পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি স্থাপন।
বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সহ-সভাপতি এবং পিএইচপি শিপ ব্রেকিং অ্যান্ড রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জহিরুল ইসলাম রিংকু বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের দেশে বিশ্বের অন্যতম পরিবেশবান্ধব জাহাজ পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি ও সুবিধা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এক দশকের বেশি সময় ধরে আমরা বৈশ্বিক বাজারে নেতৃত্ব দিয়ে আসছি। এ বছর আরও গ্রিন ইয়ার্ড চালু হলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।’
কমেছে জাহাজ আমদানি
পরিবেশগত অগ্রগতি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাহাজ আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। শিল্পখাতের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মাত্র ৮৪টি জাহাজ পুনর্ব্যবহারের জন্য আমদানি করা হয়েছে, যার মোট ওজন প্রায় ৭ লাখ ১৬ হাজার টন। এটি গত দুই দশকের মধ্যে অন্যতম নিম্নমুখী পারফরম্যান্স।
২০০০ থেকে ২০১০-এর দশকের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে ১৫০ থেকে ২০০টি জাহাজ আমদানি হতো। ২০২১ সালে সর্বোচ্চ ২৮০টি জাহাজ ভাঙা হয়, যার মোট ওজন ছিল প্রায় ২৭ লাখ ৩০ হাজার গ্রস টন।
তবে ২০২২ সালে আমদানি কমে দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ ৪০ হাজার টনে। ২০২৩ সালে তা আরও কমে ১০ লাখ টনের সামান্য ওপরে নেমে আসে এবং ২০২৪ সালেও ১০ লাখ টনের নিচে থাকে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, দুর্বল ফ্রেইট বাজার এবং পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের বাড়তি ব্যয়কে এই মন্দার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
তবে শিল্প নেতাদের বিশ্বাস, আইএমও’র এই স্বীকৃতি বৈশ্বিক জাহাজ পুনর্ব্যবহার বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন পুনর্ব্যবহার গন্তব্য খুঁজছেন এমন জাহাজ মালিকদের আকৃষ্ট করবে।


