কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরগুলোতে আবারও বেড়েছে গোলাগুলি, সংঘর্ষ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা। আধিপত্য বিস্তার, মাদক কারবার, চোরাচালান ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে চলমান দ্বন্দ্বে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সাধারণ রোহিঙ্গারা। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আশ্রয়শিবিরে কর্মরত দেশি-বিদেশি সংস্থার কর্মকর্তারাও।

রোহিঙ্গা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, বর্তমানে ক্যাম্পগুলোতে অন্তত ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) ও আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন (আরএসও) সবচেয়ে বেশি তৎপর। ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসা, অপহরণ, মানবপাচার ও চোরাচালানকে কেন্দ্র করে এসব গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত বাড়ছে।

সর্বশেষ গত ৬ মে উখিয়ার বালুখালী ক্যাম্প-৮ পশ্চিমের বি-ব্লকে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মোহাম্মদ কামাল (৩৫) নামে এক রোহিঙ্গাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী নবী হোসেনের ছোট ভাই এবং ওই ব্লকের মাঝি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

রোহিঙ্গা নেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, নবীর হাত ধরেই ইয়াবা ও ক্রিস্টাল মেথের (আইস) বড় বড় চালান ঢুকছে উখিয়া ও টেকনাফে। ক্যাম্পগুলোতে প্রতি মাসে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকার ইয়াবা ও আইস ঢুকছে। ৯০ শতাংশ ইয়াবার কারবার নবী হোসেন বাহিনীর কবজায়। নবী হোসেনের এই কারবারে সহযোগিতা দেয় মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান সলিডারিটি অর্গানাইজেশনসহ (আরএসও) আরও তিনটি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনী। বিনিময়ে তারা পায় মাদক বিক্রির টাকার ভাগ।

এর আগের দিন ক্যাম্প-৭ এলাকায় সশস্ত্র হামলায় নিহত হন কেফায়েত উল্লাহ হালিম নামে আরসার এক নেতা। এ ঘটনায় আহত হন আরও দুজন। স্থানীয় সূত্র জানায়, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নবী হোসেনের গ্রুপের সঙ্গে বিরোধের জেরে কেফায়েত উল্লাহ আলাদা সশস্ত্র গোষ্ঠী গড়ে তোলেন। এরপর থেকেই দুই পক্ষের মধ্যে সংঘাত তীব্র আকার ধারণ করে।

কে এই নবী হোসেন

২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে নিপীড়নের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় আট লাখ রোহিঙ্গা। এই রোহিঙ্গা ঢলের সঙ্গে আসেন নবী হোসেনও। তার বাড়ি রাখাইন রাজ্যের মংডু শহরের ঢেকুবনিয়ায়। বাবার নাম মোস্তাক আহমদ। তার ঠাঁই হয় উখিয়ার বালুখালী আশ্রয়শিবিরের (ক্যাম্প-৮ পশ্চিম) বি-ব্লকের ৪১ নম্বর শেডে। ২০১৮ সালের শুরুতে মিয়ানমার থেকে আশ্রয়শিবিরে এবং টেকনাফে ইয়াবার বড় চালান আনা শুরু করেন নবী হোসেন। তখন টেকনাফের একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন নবী। আশ্রয়শিবিরে নিজের নামে গড়ে তোলেন ‘নবী হোসেন’ বাহিনী। এই বাহিনীর সদস্য তিন শতাধিক।

পুলিশ ও রোহিঙ্গা নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, নবী হোসেনের এক ভাই ভুলু ক্যাম্প-৮ পশ্চিমের ডি ব্লক এবং আরেক ভাই মোহাম্মদ কামাল বি-৪১ ব্লকের মাঝির দায়িত্বে ছিলেন। আরসার হুমকিতে আত্মগোপনে ছিলেন কিছুদিন। বালুখালী এলাকার চারটি আশ্রয়শিবির (ক্যাম্প-৮ পশ্চিম, ৯, ১০ ও ১৪) নবী হোসেন বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। টাকার ভাগ বসিয়ে মাদক চোরাচালানে নবী হোসেনকে সহযোগিতা দেয় আরও ৯টি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী বাহিনী। এদের মধ্যে রয়েছেন মাস্টার মুন্না, ইসলাম, আবদুল হাকিম, আসাদ, জুবাইর, জাবু, মুমিন, জাকির ও শফিউল্লাহ বাহিনী।

২০২২ সালে মার্চে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরসহ উখিয়া ও টেকনাফে নবী হোসেনকে জীবিত অথবা মৃত ধরে দিতে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে পোস্টার সেঁটেছিল বিজিবি কক্সবাজার ৩৪ ব্যাটালিয়ন। পোস্টারে জঙ্গলের ভেতরে অস্ত্র হাতে দাঁড়ানো নবী হোসেনের ছবি ছাপানো হয়। এতে লেখা হয়, ‘ইয়াবা গডফাদার ও মিয়ানমারের নাগরিক নবী হোসেনকে জীবত অথবা মৃত ধরে দিতে পারলে ১০ লাখ টাকা পুরস্কার প্রদান করা হবে।’ কিন্তু এখন পর্যন্ত নবী হোসেনের বিষয়ে কেউ সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।

নতুন করে আতঙ্ক

রোহিঙ্গারা বলছেন, কয়েক মাস শান্ত থাকার পর হঠাৎ পরপর দুটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় রোহিঙ্গাদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। আধিপত্য বিস্তার, মাদক ও অস্ত্রের ব্যবসা, চোরাচালান, মানব পাচার, অপহরণকে ঘিরে এসব ঘটনা ঘটছে। বর্তমানে ক্যাম্পে ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠী তৎপর রয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে দায়িত্বরত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) জানিয়েছে, উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কয়েক মাস তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করলেও সম্প্রতি পুরনো দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আবারও সংঘাত শুরু হয়েছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ক্যাম্প-২, ৬, ৭, ৮ ইস্ট, ১৪ ও ১৫ নম্বর ক্যাম্পে অন্তত কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা বেড়েছে। এসব গোষ্ঠী আধিপত্য বিস্তার, মাদক ও অস্ত্র কারবার, চোরাচালান, মানবপাচার ও অপহরণসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এসব নিয়ে বিরোধে ঘটছে হত্যাকাণ্ড।

সক্রিয় ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠী

ক্যাম্প-৮-এর বাসিন্দা মোহাম্মদ হারুন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ প্রতিরোধে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রায় দেড় বছর পর হঠাৎ করে আবার হত্যাকাণ্ড ঘটায় ক্যাম্পজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক চিহ্নিত অপরাধী কারাগার থেকে বের হয়ে পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। এর ফলে পুরনো বিরোধকে কেন্দ্র করে আবারও খুনোখুনির ঘটনা বাড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে ক্যাম্পে ছয়টি সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। এসব গোষ্ঠী ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ, মাদক, চোরাচালান এবং আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় আরও ভয়াবহ সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড বাড়ার আশঙ্কা আছে।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বর্তমানে অন্তত ছয়টি সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠী আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধে রয়েছে। যদিও কয়েক বছর আগেও এসব ক্যাম্পে প্রায় ১০টির মতো সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় ছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে অনেক গ্রুপ দুর্বল হলেও গ্রেফতার হওয়া কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও তাদের সহযোগীরা কারামুক্ত হয়ে আবারও ক্যাম্পে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নেতাদের তথ্য অনুযায়ী, আরাকান রোহিঙ্গা আর্মির প্রধান নবী হোসেন কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে পুনরায় তার গ্রুপকে সক্রিয় করেছেন। অপরদিকে আরাকান রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশনের প্রধান কেফায়েত উল্লাহ নিহত হওয়ার পর সংগঠনটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন মো. নুর ওরফে টুপি নুর। এ ছাড়া আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি কারাগারে থাকার পর ক্যাম্পে সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালনা করছেন ছলিম উল্লাহ, যিনি ইয়াহিয়া, রিয়াদ ও সেলিম নামেও পরিচিত। রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশনের নেতৃত্বে আছেন মাস্টার মো. আয়ুব। এ ছাড়াও ইসলামী মাহাজ নামের আরেকটি গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিচ্ছেন মৌলভী মো. রফিক। সবমিলিয়ে ছয় গোষ্ঠী তৎপরতা চালাচ্ছে।

বিরোধ কী নিয়ে?

এসব সশস্ত্র গোষ্ঠী ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ, মাদক ব্যবসা, মানবপাচার, অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়, ডাকাতি এবং মাদকের টাকায় অস্ত্র সংগ্রহসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেও বিভিন্ন কৌশলে তারা পুনরায় সংগঠিত হয়ে অপরাধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

আরকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস (এআরএসপিএইচ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যু সামনে এলেই ক্যাম্পে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা ও সহিংসতা সৃষ্টি করা হয়, যাতে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। এটি মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের অংশ বলে আমরা মনে করি। তাদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতে মাদক, হত্যা, অপহরণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে এসব গোষ্ঠী। ক্যাম্পে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে সরকারকে সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।’

জেলা পুলিশের তথ্যমতে, চলতি বছরের চার মাসে পাঁচটি খুনের ঘটনা ঘটছে। যা অন্য বছরের তুলনায় অনেক কম। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে ১০ ধরনের অপরাধের মধ্য বেশি মামলা হয়েছে মাদক ও অপহরণের। সবমিলিয়ে ২০১৭ সাল থেকে নয় বছরে তিন শতাধিক বেশি খুনের ঘটনায় ২৯৫টি মামলা হয়েছে।

ক্যাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি জানতে চাইলে ১৪ এপিবিএনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মৃত্যুঞ্জয় সজল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এটি সত্য। তবে সামগ্রিকভাবে ক্যাম্পের পরিস্থিতি এখন শান্ত আছে। দুটি হত্যায় জড়িত সন্দেহে ইতোমধ্যে নয় জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্যাম্পে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান ও নজরদারি অব্যাহত আছে।’

সূত্র: বাংলা ট্রিবিউন