চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার রেলপথে রোববার (৫ নভম্বর) প্রথম ট্রেন যাত্রা শুরু হচ্ছে । তবে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেনের ট্রায়াল রান নয়; মূলত এই রেলপথের নির্মাণ কাজ পরিদর্শন ও কোনো ত্রুটি আছে কি না যাচাই করতে প্রথমবারের মতো চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি কক্সবাজার আসছে একটি ট্রেন।
রোববার সকাল ৮টায় আটটি বগি ও একটি ইঞ্জিন নিয়ে ট্রেনটি চট্টগ্রাম স্টেশন ছেড়ে যাবে। এতে থাকবেন রেলের পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। এ সময় নির্মাণাধীন দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন ও বিভিন্ন স্টেশন পরিদর্শন করা হবে। এতে কোনো ত্রুটি আছে কি না তা যাচাই করবেন।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক মো. সুবক্তগীন বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের ইন্সপেকশন টিম দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ পরিদর্শন করবেন। রোববার সকাল ৮টায় চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের পথে ট্রেন চলবে। এই ট্রেনে করে তারা এই রেলপথের বিভিন্ন জায়গায় দাঁড়াবে এবং আস্তে আস্তে আসবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন এই নব-নির্মিত রেলপথের ব্রীজগুলোতেও দাঁড়াবে। মূলত উদ্বোধনের আগে দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ খুঁটিনাটি সব বিষয় পর্যবেক্ষণ করবেন বাংলাদেশ রেলওয়ের ইন্সপেকশন টিম। সকালে ট্রেনটি ছাড়লেও কক্সবাজার পৌছাতে পৌছাতে বিকেল হয়ে যাবে।
মো. সুবক্তগীন বলেন, দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্পের কর্মকর্তা থাকবে ৮ থেকে ১০ জন। আর বাকি সব বাংলাদেশ রেলওয়ের ইন্সপেকশন টিমের কর্মকর্তারা থাকবেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ে অতি: মহাপরিচাল (অবকাঠামো) মো. মফিজুর রহমান বলেন, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে রবিবার কোন ট্রায়াল রান হচ্ছে না। গর্ভামেন্ট ইন্সপেক্টর অব বাংলাদেশ রেলওয়ে আছে তারা এই রেলপথ ইন্সপেকশন করবে। এটা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটা বিভাগ। যেটা বাংলাদেশ রেলওয়ের বাইরে কিন্তু রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন গর্ভামেন্ট ইন্সপেক্টর।
মো. মফিজুর রহমান বলেন, ‘এটা ইঞ্জিনের ট্রায়াল বা গাড়ির ট্রায়াল না, এটা হলো রেল লাইন ঠিক আছে কিনা রেল চলতে পারবে কিনা, সেটা তাদের যাচাই করতে হয়। সেজন্য তারা এটা ইন্সপেকশন করবে যে হ্যা এটা ঠিক আছে আর কত স্পীডে ট্রেন চলতে পারবে। এটা ট্রায়াল রান নয়, এটা গর্ভামেন্ট ইন্সপেকশন। প্রধানমন্ত্রী যখন এই রেলপথ উদ্বোধন করবে তার আগে জানান দেয়ার জন্য সেটা করা হয়।
॥ প্রস্তুত কালুরঘাট সেতু ॥
চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর উপর কালুরঘাট সেতুতে ট্রেন ইঞ্জিনের ট্রায়াল রান সফল হয়েছে। শনিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত তিনটি রেল ইঞ্জিন চালিয়ে যাচাই করা হয়।
শুরুতে সাড়ে ১০ টনের ২২০০ সিরিজের ইঞ্জিন, তারপর ১১ দশমিক ১৬ টনের ২৯০০ সিরিজের ইঞ্জিন এবং সবশেষ ১৫ টনের ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিন সেতুতে চলাচল করে। আর এই ৩০০০ সিরিজের ইঞ্জিন দিয়েই কক্সবাজার পথের ট্রেন চলবে।
ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজারের পথে যেতে হলে ট্রেনকে প্রায় শতবর্ষী এই সেতু পাড়ি দিতে হবে। এ জন্য সংস্কার কাজের জন্য গত ১ অগাস্ট তিন মাসের জন্য সেতুটিতে যান চলাচল বন্ধ করা হয়।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী ১১ নভেম্বর কক্সবাজারের পথে ট্রেন চলাচল উদ্বোধন করবেন বলে জানানো হয়েছে। এর আগে আজ রোববার ৮টি বগি ও একটি ইঞ্জিন নিয়ে দোহাজারী-কক্সবাজার নবনির্মিত রেলপথে যাবে ইন্সপেকশন টিম। তারা রেলপথ, স্টেশনসহ সব বিষয় যাচাই করে দেখবে।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পের পরিচালক মো. সুবক্তগীন বলেন, আজ তিন রকমের ইঞ্জিন ট্রায়াল সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। কালুরঘাট সেতু ট্রেন চলাচলের জন্য প্রস্তুত আছে। বুয়েটের বিশেষজ্ঞ পরামর্শক দল ও রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী মো. আবু জাফর মিঞা বলেন, ‘কালুরঘাট সেতুর ওপর দিয়ে এখন ট্রেন চলাচলে আর কোন বাঁধা নাই। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের সঙ্গে নতুন জেলা হিসেবে যুক্ত হবে কক্সবাজার। শনিবার আমরা নতুন মডেলের ইঞ্জিন দিয়ে একাধিকবার ট্রায়াল রান করেছি।
চট্টগ্রাম নগরীর সঙ্গে বোয়ালখালী ও পটিয়া উপজেলার একাংশের যোগাযোগের মাধ্যম এই কালুরঘাট সেতু। সড়ক পথের সব ধরনের যানবাহনের পাশাপাশি এ সেতু দিয়ে ট্রেনও চলে। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ আমলে নির্মিত হয় ৭০০ গজ দীর্ঘ রেল সেতুটি। ১৯৫৮ সালে সেতুটি সব ধরনের যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় পাকিস্তান সরকার। ২০১০ সালে তৃতীয় শাহ আমানত সেতু উদ্বোধনের আগ পর্যন্ত কালুরঘাট সেতু দিয়ে ভারী যান চলাচলের কারণে সেটি নাজুক হয়ে পড়ে। ২০০১ সালে সেতুটি ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করার পর ২০০৪ ও ২০১২ সালে দুই দফা সংস্কার করেছিল রেল কর্তৃপক্ষ।
প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা খরচ করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এই রেলপথ। ভাড়া প্রস্তাব করা হয়েছে: ঢাকা থেকে নন এসি শোভন চেয়ার ৫১৫ টাকা, এসি সিট ৯৪৮ টাকা, এসি কেবিন ১ হাজার ৩৬৩ টাকা এবং এসি বার্থ ২ হাজার ৩৬ টাকা।
চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি) ও বাংলাদেশের তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এবং চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) ও বাংলাদেশের ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড পৃথক দুই ভাগে কাজটি করছে।
দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইনের আওতায় ৩৯টি বড় সেতু, ২২৩টি ছোট সেতু ও কালভার্ট, বিভিন্ন শ্রেণির ৯৬টি লেভেল ক্রসিং। হাতি চলাচলের জন্য রয়েছে আন্ডারপাস। দুইটি আন্ডারপাস আছে। নির্মাণ করা হয়েছে ৯টি স্টেশন। স্টেশনগুলো হলো- দোহাজারী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, হারবাং, চকরিয়া, ডুলাহাজরা, ইসলামাবাদ, রামু ও কক্সবাজার।
বাংলাদেশ রেলওয়ে অতি: মহাপরিচালক (অবকাঠামো) মো. মফিজুর রহমান বলেন, সবাই চাই দ্রুত ঢাকা-কক্সবাজার ট্রেন চলাচল শুরু হোক। আমরা আশা করছি, ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকা-কক্সবাজার রেলপথে ট্রেন চলাচল করতে পারবে।

