১৯৯৭ সালে যখন পার্বত্য শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয় তখন সে অঞ্চলে পাহাড়িদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনটি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)। এর নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমা। কিন্তু এ শান্তি চুক্তি সম্পাদনের পর থেকেই সন্তু লারমার দলে নানা ধরনের অস্থিরতা এবং বিভক্তি দেখা দিতে শুরু করে। যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তী বিভিন্ন বছরে বহু সংগঠন পার্বত্য এলাকায় তৈরি হয়েছে যাদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং সংঘাত লেগে আছে। পাহাড়ে অশান্তির মূলে রয়েছে এই দল-উপদলগুলোর স্বেচ্ছাচারিতা ও আধিপত্য বিস্তার।
শান্তি চুক্তি সম্পাদনের পর থেকে তরুণদের একটি অংশ ১৯৯৮ সালে আলাদা একটি সংগঠন গঠন করে। পাহাড়ি ছাত্রনেতা প্রসীত খীসার নেতৃত্বে এর নাম হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এই অংশটি শান্তি চুক্তি সম্পাদন মেনে নেয়নি। শান্তি চুক্তির কিছু বিষয় নিয়ে তাদের আপত্তি ছিল। ২০০৭ সালে এসে এই জনসংহতি সমিতি আবার ভাঙ্গনের মুখে পড়ে। জনসংহতি সমিতির কিছু নেতা জনসংহতি সমিতি সংস্কারপন্থী বলে আরেকটি সংগঠন গঠন করে। ২০১০ দশ সালে পিসিজেএসএস মূল আদর্শ থেকে সরে গেছে দোহাই দিয়ে আবার ভাঙ্গনের শিকার হয়। তারা দলটির আদি নেতা প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার অনুসারী দাবি করে জেএসএস (এমএন লারমা) গঠন করে। এদিকে প্রায় ২০ বছর পরে ইউপিডিএফ আরেকদফা ভাঙ্গনের মুখে পড়ে। ২০১৭ সালে এটি ভেঙে আরেকটি সংগঠন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামে আরেকটি সংগঠনের জন্ম হয়। এভাবে দল-উপদল বৃদ্ধির সাথে সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে এই দল বা সংগঠনগুলোর পরস্পরের মধ্যে প্রতিযোগিতা দ্বন্দ্ব-সংঘাত বেড়েই চলছে।
যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি থেকে ইউপিডিএফ গঠিত হয়েছিল তখন ইউপিডিএফ ও মূল পিসিজেএসএস এর মধ্যে খুবই বিরোধ ছিল। কিন্তু ইউপিডিএফ যখন আরেক দফা ভাঙ্গনের মুখে পড়ে তারপর থেকে এই ইউপিডিএফ অর্থাৎ মূল ইউপিডিএফ এবং মূল জেএসএস কাছাকাছি চলে আসে। এদের মধ্যে তেমন কোনো দ্বন্দ্ব সংঘাত নেই। তবে ইউপিডিএফ মূল অংশ এবং ইউপিডিএফ'র গণতান্ত্রিক অংশের মধ্যে সংঘাত বেড়েছে। আবার সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে মূল জেএসএসের বিরোধ আছে। সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে আবার ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক সংগঠনটির মধ্যে তেমন একটা বিরোধ নেই। তাদের নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ আছে বলে নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রগুলো বা স্থানীয়রা দাবি করেছেন।
আরও একাধিক গ্রুপ পার্বত্য এলাকায় তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। এদের মধ্যে লিবারেশন পার্টি( এলপি), মগ পার্টি এবং সাম্প্রতি সময়ে সংবাদের শিরোনাম হওয়া কুকি চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। এলপির অবস্থান হচ্ছে বান্দরবানের গভীরে। মগ পার্টি একেবারে সীমান্তে অন্যান্য কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে মিলে অপরাধমূলক কার্যকলাপে অংশ নেয়। নিরাপত্তা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, তবে দুটি গোষ্ঠীরই তৎপরতা শুধু বান্দরবানে সীমাবদ্ধ। রাঙ্গামাটি কিংবা খাগড়াছড়িতে এদের তেমন কোনো তৎপরতার কথা জানা যায় না।
পাহাড়ের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন গড়ে তোলাই এসব সংগঠনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। তাহলে স্বভাবতই এ প্রশ্ন উঠছে, এত সংগঠন হওয়ার কারণ কি? অভিযোগ আছে এগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হওয়ার পেছনে নিরাপত্তা বাহিনীর হাত আছে। ১৯৯৮ সালে জেএসএস ভেঙে ইউপিডিএফ গঠনের পেছনে নিরাপত্তা বাহিনীর একটা বড় সমর্থন ছিল বলে একটা বড় অভিযোগ ছিল। নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর স্বার্থ, ইউপিডিএফ গঠিত হলে জেএসএস এর শক্তি দুর্বল হয়ে যাবে। আবার ইউপিডিএফ নিয়ন্ত্রণের বাইরে গেলে সেটিও ভেঙ্গে দেয়।
তবে এসব অভিযোগ গায়ে মাখছে না নিরাপত্তা বাহিনীগুলো। তারা বরাবরই বলছে, এর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা সবসময় জোরালোভাবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। সাম্প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক রাজনৈতিক বোদ্ধাদের দাবি, বিভিন্ন সময়ে দলগুলোর ভাঙ্গনের একমাত্র কারণ বিপুল পরিমাণ চাঁদার অর্থ ভাগবাটোয়ারা নিয়ে দ্বন্দ্ব। অপহরণ, খুন, চাঁদাবাজি করে নিজেদের আধিপত্যের জানান দিতে তারা পাহাড়ে ভয়াবহ অস্থিরতা সৃষ্টি করে রেখেছে।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জরিপে উঠে এসেছে, এই অঞ্চলে ২০২৩ সালেই চাঁদাবাজির পরিমান রাঙ্গামাটি জেলায় ২৪৪.৭০ কোটি, খাগড়াছড়ি জেলায় ৮৬.২২ কোটি এবং বান্দরবান জেলায় ২০.২১ কোটি। এছাড়াও গোপন চাঁদাবাজিসহ মোট টাকার অনুমান অন্তত ৬০০ কোটির কাছাকাছি বলে মনে করেন তারা। এই বড় অংকের টাকার পরিমাণ নিজেদের মধ্যে ভাগ হওয়া নিয়ে নতুন দল গঠন হয়।
এত টাকার উৎস্য কি কি?
(চলবে......)
অরবিন্দ বাগচী
পার্বত্য সময়

