পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি ভূ-রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত দিক থেকে অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চল। যেখানে দীর্ঘদিন ধরে জাতিগোষ্ঠীগত বৈষম্য, ভূমি বিরোধ এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু বা শরণার্থী সংকট বিদ্যমান। এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির পর গঠন করা হয় “ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন সম্পর্কিত টাস্কফোর্স”। যার মূল উদ্দেশ্য ছিল দুটি। এক. ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থীদের পুনর্বাসন এবং দুই. অভ্যন্তরীণ ক্ষতিগ্রস্ত উপজাতী ও অ-উপজাতীয় উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন।

প্রথম কাজটি সম্পন্ন হলেও দ্বিতীয় কাজ অর্থাৎ “অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন” তিন দশক সময় গেলেও আজও কেনো কারণে ঝুলে আছে কিনা তা খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। বিভিন্ন পক্ষের অভিযোগ আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দেশি-বিদেশী ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্তের কারণে তা হচ্ছে না। বিশেষ করে ৩ পার্বত্য জেলার বাস্তুচ্যুত বাঙালি উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন নিয়ে টাস্কফোর্সের একপেশে ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, পার্বত্য চট্টগ্রাম কি বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর কাছে বন্ধক দেওয়া হয়েছে?

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সূত্রে ১৯৯৮ সালে টাস্কফোর্স গঠনের পর সে বছরের ২৭ জুন অনুষ্ঠিত সভায় অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের সংজ্ঞা ও সংখ্যা নির্ধারণে একটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার সিদ্ধান্ত “ক” অনুযায়ী বলা হয়— ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হতে ১৯৯২ সালের ১০ আগস্ট (তৎকালীন শান্তিবাহিনীর অস্ত্রবিরতির শুরুর দিন) পর্যন্ত পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজিত অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে যেসকল উপজাতি নিজ এলাকা ত্যাগ করে স্বদেশের মধ্যে অন্যত্র চলে গেছেন, তারা অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে বিবেচিত হবেন। তবে একই সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত অ-উপজাতীয় (বাঙালি) ব্যক্তিদের পুনর্বাসনের বিষয়টি একই সাথে ভিন্নভাবে বিবেচনা করা হবে।

টাস্কফোর্স তার কার্যক্রম চালাতে গিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে ৮৯,২৮০ উপজাতীয় পরিবার এবং ৫৭,৬৯২ অ-উপজাতীয় (বাঙালি) পরিবারকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে চিহ্নিত করে। অথচ এর আগে ১৯৯৭ সালের ১২ নভেম্বর, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক (প্রশাসন) জনাব মসিউর রহমান স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়—পার্বত্য চট্টগ্রামে ৬১,২০২টি অ-উপজাতীয় তথা বাঙালি উদ্বাস্তু পরিবার রয়েছে (খাগড়াছড়িতে ৪৫,২৭০ পরিবার, রাঙামাটিতে ১৫,৬৭৩ পরিবার এবং বান্দরবান জেলায় ২৫৯ পরিবার)। অর্থাৎ পার্বত্য চুক্তি সম্পাদনের পূর্বেই সরকার এই বিশাল সংখ্যাটি সরকারি নথিতে স্বীকার করে নিয়েছিল। কিন্তু টাস্কফোর্স পরবর্তীতে যে তালিকা করে, সেখান থেকেও রহস্যজনকভাবে প্রায় ৪ হাজার বাঙালি পরিবারকে বাদ দেওয়া হয়। এই সংখ্যাগত কারচুপি কোনো ভুল, নাকি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র? তাও খতিয়ে দেখার প্রয়োজন বলে মনে করে আসছেন বিশ্লেষকরা।

টাস্কফোর্সের কার্যবিবরণী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বহু কাঠখড় পুড়িয়ে টাস্কফোর্স ১১ বছরের মাথায় এসে— ২০০৯ সালের ৫ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউজে অনুষ্ঠিত সভায় অ-উপজাতীয় ৫৭,৬৯২ বাঙালি পরিবারের তালিকা পুনর্বাসনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু প্রায় ৩ মাসের মাথায় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সভায় জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) তথা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তু লারমার প্রতিনিধি জনাব লক্ষ্মীপ্রসাদ চাকমা উক্ত বাঙালি পরিবারগুলোকে টাস্কফোর্সের পুনর্বাসন তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি জানান।

যদিও উক্ত সভায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন ও জিওসির প্রতিনিধিরা স্পষ্ট যুক্তি দিয়ে বলেন— “যিনি বাস্তু থেকে উৎখাত হয়েছেন, তিনিই উদ্বাস্তু। এক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত উপজাতীয় ও অ-উপজাতীয় সকল নাগরিককেই অন্তর্ভুক্ত রাখা বাঞ্ছনীয়।” কিন্তু আঞ্চলিক দলের অনড় অবস্থানের কারণে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়।

পরবর্তীতে ২০১৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ৪র্থ টাস্কফোর্স সভায় জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা নিজে উপস্থিত থেকে বাঙালি উদ্বাস্তুদের টাস্কফোর্সের আওতাভুক্ত করার সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। তার বিরোধিতার মুখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়- বাঙালি ক্ষতিগ্রস্তদের সরকার চাইলে ভিন্ন কোনো কর্মসূচির মাধ্যমে পুনর্বাসন করতে পারে, টাস্কফোর্স তাদের দায়িত্ব নেবে না। তখন বিষটিকে চক্রান্তমূলক বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় পার্বত্য বাঙালি নেতৃবৃন্দ।

এরপর ২০১৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ৫ম সভায় সন্তু লারমা উপস্থিত থেকে বাঙালি পুনর্বাসনের সেই সুযোগটুকুও বাতিল করে দেন বা বাতিল করিয়ে নেন। অর্থাৎ উপজাতীয় ৮৯,২৮০ পরিবারের পুনর্বাসন বহাল রাখা হলেও অ-উপজাতীয় ৫৭,৬৯২ বাঙালি পরিবারের বিষয়টি পুরোপুরি মুছে ফেলার চক্রান্ত করা হয়।

বিভিন্ন সূত্রমতে দীর্ঘ সময় ধরে জিওসির প্রতিনিধি এবং সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মানবিক কারণে বারবার বাঙালি উদ্বাস্তুদের অন্তর্ভুক্তির দাবি তোলা হলেও আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর বাধার মুখে তা কার্যকর হতে দেওয়া হয়নি।

পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারায় টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ এবং আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব নিয়ে নতুন বিতর্ক দেখা দেয়। বিশেষ করে টাস্কফোর্সে থাকা একমাত্র বাঙালি প্রতিনিধির পদত্যাগের পর বাঙালি প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই একের পর এক বিতর্কিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চালানোর চেষ্টা করা হয়।

১৬ সদস্যের এই শক্তিশালী এ টাস্কফোর্স কমিটির কাঠামো নিয়েও আছে বিস্তর অভিযোগ। টাস্কফোর্সে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্ধাদের সকল পক্ষের প্রতিনিধি না রাখার অভিযোগ করে আসছেন সংশ্লিষ্ট পক্ষ। টাস্কফোর্স কমিটির কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়— বাধ্যতামূলকভাবে উপজাতি সম্প্রদায় থেকে ১ জন চেয়ারম্যানের পদ রাখা হয়েছে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন- ৩ পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (উপজাতীয়) — ৩ জন। ৩ সার্কেলের চিফ (উপজাতীয়) — ৩ জন। জেএসএস প্রতিনিধি (উপজাতীয়)— ১ জন। ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রতিনিধি — ১ জন। সর্বমোট বাধ্যতামূলক উপজাতীয় সদস্য — ৯ জন।

বিপরীতে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের অর্ধেকেরও বেশি জনসংখ্যার প্রতিনিধি হিসেবে মাত্র ১ জন বাঙালি সদস্য পদ রাখা হয়। যার নিয়োগেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত গুচ্ছগ্রাম বাঙালি পরিবারের সদস্যের বাহির থেকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

এর বাইরে বাকি সদস্যরা প্রশাসনিক কর্মকর্তা। যেমন-বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও জিওসি প্রতিনিধি), যারা কেবল সরকারি দায়িত্বে থাকেন।

চেয়ারম্যানসহ ৯ জন স্থানীয় উপজাতির বিপরীতে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি প্রতিনিধি ছাড়া একক গোষ্ঠীভিত্তিক মনস্তত্ত্ব দিয়ে তৈরি এই টাস্কফোর্স কীভাবে একটি অঞ্চলের পুরো একটি জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে— তা আজ এক বড় জাতীয় প্রশ্ন।

তাই অভিযোগ উঠেছে- পার্বত্য চট্টগ্রামে ৬১ হাজারের অধিক বাস্তুচ্যুত বাঙালি পরিবারের নাগরিক ও সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে একটি বিশেষ মহল। যাদের কাজ ছিল গৃহহীন ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে পুনর্বাসিত করা, তারা আজ একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে বাদ দেওয়ার নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে। এই চক্রান্ত কেবল মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন নয়, বরং এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতির জন্য মারাত্মক হুমকি।

বর্তমানে একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী সরকার দায়িত্ব পালনের প্রেক্ষাপটে সময় এসেছে এই টাস্কফোর্সের একপেশে বৈষম্যমূলক আইন ও কাঠামো পুনর্গঠন করার। সকল জাতিগোষ্ঠীর সমান প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে ৬১ হাজার বাঙালি উদ্বাস্তু পরিবারকে অবিলম্বে টাস্কফোর্সের আওতায় এনে ভূমি ও আবাসনের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি, ন্যায়বিচার ও জাতীয় সংহতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

লেখক: এ এইচ এম ফারুক 
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
(পার্বত্য চট্টগ্রাম, রোহিঙ্গা ও সীমান্ত নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক)
ইমেইল: ahmfarukcht@gmail.com