বিভিন্ন সংক্রামক রোগের জীবাণুর পূর্ণাঙ্গ জিনোমরহস্য উন্মোচনের জন্য ২০২২ সালের অক্টোবরে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিভাসু) বসানো হয়েছিল ‘নেক্সট সেক-২০০০’ নামের একটি যন্ত্র। ৪ কোটি ৬০ লাখ টাকায় কেনা যন্ত্রটি শিক্ষকদের তেমন কাজে আসছে না। এক বছর ধরে অনেকটা অব্যবহৃত পড়ে আছে।
আমেরিকায় তৈরি এ যন্ত্র বসানোর পর ২০২২ সালের অক্টোবরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলেছিল, ১৫ দিন পর পরীক্ষামূলকভাবে যন্ত্রটি দিয়ে জীবনরহস্য উদ্ঘাটনের কাজ শুরু করা হবে। পরীক্ষাগারে কর্মরত ব্যক্তিদের তিন দফায় প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হবে। কিন্তু সেই প্রশিক্ষণ এখনো শেষ করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। যন্ত্রটিও বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়নি। অথচ অ্যালোমিনা এনইএক্স ব্র্যান্ডের যন্ত্রটি কেনা হয়েছিল সিভাসুর নিজ অর্থায়নে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি অ্যান্ড প্যারাসাইটোলজি বিভাগের অধ্যাপক এ এম এ এম জুনায়েদ ছিদ্দিকী হালদা নদীর ৩০টি মাছের নমুনা নিয়ে গবেষণা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রে এসব নমুনার জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের জন্য প্রায় এক বছর ধরে ঘুরেছেন তিনি। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এ যন্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে বাধ্য হয়ে চীনের একটি গবেষণাগারে নমুনা পাঠিয়ে জিনোম সিকোয়েন্স শেষ করতে হয় এ শিক্ষককে। এতে খরচ হয় ১০ লাখ টাকা।

এ এম এ এম জুনায়েদ ছিদ্দিকী বলেন, ‘এক বছর অপেক্ষা করেও বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রটি ব্যবহার করতে পারিনি। কাল-পরশু করে এক বছর সময় নষ্ট হয়েছে। যন্ত্রটি কোনো শিক্ষকের কাজে আসছে না। একটি নমুনাও পরীক্ষা করা হয়নি। অব্যবহৃত অবস্থায় এটি পড়ে আছে। বাধ্য হয়ে বাড়তি টাকা খরচ করে বিদেশি গবেষণাগার থেকে কাজ সারতে হচ্ছে।’
জেনেটিকস অ্যান্ড অ্যানিমেল ব্রিডিং বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল ইসলামও দক্ষিণ কোরিয়ার একটি গবেষণাগার থেকে নমুনার সিকোয়েন্স করে এনেছেন। তিনি বলেন, ‘নেক্সট সেক যন্ত্রটি ব্যবহার করতে পারিনি। এ কারণে দেশের বাইরে থেকে কাজ করিয়ে আনতে হচ্ছে। এতে সময় ও অর্থ—দুটিই বেশি লাগছে। কাজটাও নিজের মতো করতে পারছি না।’
জেনেটিকস অ্যান্ড অ্যানিমেল ব্রিডিং বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তাহমিনা বিলকিস বর্তমানে একটি জীবাণুর জিনোম সিকোয়েন্স নিয়ে গবেষণা করছেন। সিভাসুর যন্ত্রটি চালু না হওয়ায় বাইরের প্রতিষ্ঠান থেকে কাজ করাতে হবে জানান তিনি। তাহমিনা বিলকিস বলেন, নিজের বিশ্ববিদ্যালয়ে যন্ত্র থাকার পরও গবেষণা প্রকল্পের কাজ বাইরে থেকে করতে হচ্ছে। প্রকল্পের টাকা চলে যাচ্ছে বাইরে।
শুধু শিক্ষকেরাই যে যন্ত্রটি ব্যবহার করতে না পেরে অন্য গবেষণাগারে কাজ করছেন, তেমনটি নয়; শিক্ষার্থীরাও একই ভোগান্তি পোহাচ্ছেন। এমনই একজন মোহাম্মদ আবুল ফজল। তিনি মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ বিভাগে পিএইচডি করছেন। তিনিও বাইরের প্রতিষ্ঠান থেকে জীবাণুর জিনোম সিকোয়েন্স করে এনেছেন। আবুল ফজল বলেন, সিভাসুতে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের যন্ত্র থাকা সত্ত্বেও দেশের বাইরে নমুনা পাঠাতে হয়েছে। এতে খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। সিভাসুতে করলে খরচ কম হতো।
যেসব কারণে ব্যবহার করা যাচ্ছে নাঃ যন্ত্রটি ব্যবহার না হওয়ার বিষয়ে সিভাসুর উপাচার্য এ এস এম লুৎফুল আহসান বলেন, যন্ত্রটি ব্যবহার করার জন্য কিছু সহায়ক যন্ত্রপাতি (সাপ্লিমেন্টারি ইকুইপমেন্ট) কিনতে হবে। যন্ত্রটি বসানোর সময় এসব সরঞ্জাম কেনা হয়নি। এ অর্থবছরে কেনাকাটা শেষ করে দ্রুত সময়ের মধ্যে জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের যন্ত্রটি চালু করা হবে।
যন্ত্রটি বসানো হয়েছে পোলট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার গবেষণাগারে। এ গবেষণাগারের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ বিভাগের অধ্যাপক হিমেল বড়ুয়া। বৃহস্পতিবার (১১ জানুয়ারি) দুপুরে হিমেল বড়ুয়ার কার্যালয়ে গিয়ে যন্ত্রটি ব্যবহার না হওয়ার বিষয়ে কথা হয়। এ সময় তিনি বলেন, যন্ত্রটি ব্যবহার করার জন্য প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। ইতিমধ্যে ২০২২ সালের নভেম্বরে আটজনকে, গত বছরের ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি পাঁচজনকে ও ৪ থেকে ১০ মে পাঁচজনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আরেকটি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলতি জানুয়ারিতেই হবে। প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। তবে কত দিনের মধ্যে শিক্ষকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে, সেটি জানাতে পারেননি তিনি।
প্রশিক্ষণ শেষ করতে এক বছর সময় লাগার কারণ জানতে চাইলে হিমেল বড়ুয়া বলেন, নির্বাচনের কারণে কিছুটা দেরি হয়েছে। নয়তো আরেকটা প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শেষ করা যেত। তবে মাইক্রোবায়োলজি অ্যান্ড ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ বিভাগের শিক্ষক ইফতেখার আহমেদ বলেন, সর্বোচ্চ দুই মাসের মধ্যে প্রশিক্ষণ শেষ করে যন্ত্রটি ব্যবহার উপযোগী করা সম্ভব, কিন্তু সেটি করা হচ্ছে না।
-পার্বত্য সময়

