স্কুল থেকে ফিরে বই-খাতা রেখেই ছুটতেন মাঠে। ক্রিকেটের নেশা যেন পেয়ে বসেছিল। নাওয়াখাওয়া বাদ। খেলার জন্য বাবার পিটুনি, মায়ের বকুনিও কম খাননি। স্বপ্ন ছিল বড় ক্রিকেটার হওয়ার। কিন্তু রাঙামাটির দুর্গম জুরাছড়িতে ক্রিকেটের আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বলতে গেলে কিছুই নেই। ফলে নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া তনয় চাকমার টেপ টেনিস ছেড়ে আর পেশাদার ক্রিকেট খেলা হয়ে ওঠেনি।

তবে সব সময় চাইতেন অন্যদের মাঝেও নিজের স্বপ্ন ছড়িয়ে দিতে। সময় পেলেই ঢু মারতেন রাঙামাটি কিংবা চট্টগ্রামের স্টেডিয়ামে, পেশাদার কোচদের কাছ থেকে তালিম নিতে। আর ইউটিউবে কোচিং নিয়ে দেশ-বিদেশের অনেকের টিউটোরিয়াল তো আছেই। তনয়ের সামনে কোচিংয়ের সুযোগটা এলো ২০১৯

সালে।

বাড়ির কাছেই ভুবনজয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়। আসা-যাওয়ার পথে দেখতেন, মাঠে মেয়েরা খেলছে। একদিন এক মেয়ের ব্যাটিং দেখে রীতিমতো অবাক তিনি, ক্রিকেটের এমন কোনো শট নেই যে সে পারে না। তনয়ের মনে হলো, একটু নির্দেশনা পেলে ওরা ভুবন জয় করতে পারে।

তখনই মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তনয়কে দেখে এগিয়ে এলেন স্কুলটির সহকারী প্রধান শিক্ষক শান্তিময় চাকমা। খেলাপাগল বলে সুনাম আছে তাঁরও। তিনি বললেন, 'কিছুদিন পরেই আন্ত স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্ট শুরু হবে। কেবল অংশগ্রহণ নয়, এবার আমি জিততে চাই। তুমি কি পারবে ওদের একটা দল হিসেবে গড়ে তুলতে?'

শান্তিময় স্যারের প্রস্তাব শুনে নিজের স্বপ্নটাও মাথাচাড়া দিয়ে উঠল তনয়ের। 'হ্যাঁ' বলতে একবারও ভাবেননি। পরদিন বিকেলে ক্রিকেট খেলতে আগ্রহী এমন মেয়েদের মাঠে ডাকলেন। গুনে দেখলেন স্বপ্নাতুর ১৭টি মুখ হাজির। কথা বলে বুঝলেন, প্রত্যেকের মধ্যে সুপ্ত বারুদ আছে। ঠিকঠাক দিয়াশলাই পেলে ওরা জ্বলে উঠবে ২২ গজে।

২০১৯ সালের ৪ জানুয়ারি এই ১৭ জনকে নিয়েই শুরু হলো জুরাছড়ি প্রমীলা ক্রিকেট একাডেমির পথচলা। সেই থেকে বিনা পয়সায় মেয়েদের ক্রিকেট শেখাচ্ছেন তনয় চাকমা। শান্তিময় চাকমার স্বপ্নপূরণে পরিশ্রম করেছেন দিনরাত। এখন সেখানে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বিভিন্ন বয়সী ৪৫ জন নারী ক্রিকেটার।

সকাল-বিকাল দুই বেলা প্র্যাকটিস চলে। সকালে স্ট্রেচিং, ওয়ার্ম আপ, ফিটনেস ট্রেনিং, পাওয়ার ট্রেনিং আর বিকেলে ক্রিকেট প্র্যাকটিস। তবে প্র্যাকটিসের পর সব সময় নাশতা জোটে না। মেয়েদের অনেকে পাঁচ-ছয় কিলোমিটার পথ হেঁটে আসে। কিন্তু প্র্যাকটিস শেষে নাশতা দিতে পারেন না বলে বিষণ্নতায় আচ্ছন্ন থাকেন তনয়। তাই ধারদেনা করে হলেও নাশতার ব্যবস্থা করেন। ২০২০ সালে।

জুরাছড়ির বাইরে মেয়েরা প্রথম খেলতে যায় রাঙামাটিতে, আন্ত স্কুল ক্রিকেট টুর্নামেন্টে। সেখানে সেরা হয়। বিভাগীয় পর্যায়েও চ্যাম্পিয়ন হয়ে উপ-অঞ্চলে রানার্স আপ হয়। তনয় বললেন, “এই মেয়েরা গ্রাম থেকে জেলা সদরেই এসেছে কম। সেখানে ঢাকা, সিলেট তো বহুদূর। ভয় আর লজ্জায় সংকুচিত ছিল অনেকে। সরঞ্জামের অভাব তো আছেই।'

এই মেয়েদের বড় সাফল্য আসে পরের বছর। বিকেএসপিতে ছয় মাসের প্রশিক্ষণের সুযোগ পায় জুরাছড়ি প্রমীলা ক্রিকেট একাডেমির ১২ জন। সেবার প্রথম বিভাগে খেলার সুযোগ পায় ১২ জন। চট্টগ্রাম বিভাগীয় দলে একজন। ২০২২ সালে সারা দেশে জাতীয় স্কুল পর্যায়ে রানার্স আপ হয় তারা। এ ছাড়া এই একাডেমির পাঁচজন ডাক পেয়েছে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে।

ক্রিকেট শিখতে এই মেয়েরা যেন বাধার পাহাড় ডিঙিয়েছে। জুমা, নিশিতা, সোনাবি চাকমার মতো তনয়ের বেশির ভাগ শিষ্য একেবারে হতদরিদ্র পরিবার থেকে আসা। অভিভাবকরাও চাইতেন না মেয়েরা এমন কোনো খেলায় জড়াক, যেটা অনর্থক। সবাই বলত-'ক্রিকেট খেলে কী করবে জীবনে? মেয়ে মানুষ কি কখনো ক্রিকেট খেলে?'

তবু অদম্য মেয়েরা আসত। এদের একজন মুন্নি চাকমা। বাবা জেলে। মা গৃহিণী। অনুশীলনের মাঠ বাড়ি থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। উঁচুনিচু পাহাড়ি পথের মতোই নানা প্রতিবন্ধকতা টপকাতে হয়েছে মুন্নিকে। জার্সি-ট্রাউজার পরে অনুশীলনে যেতে দেখলে প্রতিবেশীদের অনেকেই বিদ্রূপ করে বলত-'এই মেয়েকে বিয়ে করবে কে?' কিন্তু লোকের এসব কথাবার্তা বাউন্ডারির বাইরে রেখে মাঠে নামতেন এই অলরাউন্ডার। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেটার অধিনায়ক সাকিব আল হাসান তাঁর প্রিয় ক্রিকেটার। তাঁর মতোই বাঁহাতি তিনি। ব্যাটে- বলে সমান পারদর্শী।

২০২২ সালে সাকিব আল হাসানের সঙ্গেই গ্রামীণফোনের একটি বিজ্ঞাপনে অভিনয়ের সুযোগ পান মুন্নি। আর এবার ঢাকায় ফার্স্ট ডিভিশনে বুড়িগঙ্গা ক্রিকেট একাডেমির হয়ে খেলার প্রস্তাব পেয়েছেন। শুধু মুন্নি নয়, খেলাধুলার সুবাদে জুরাছড়ি প্রমীলা ক্রিকেট একাডেমি থেকে এ পর্যন্ত ১৫ জন মেয়ে চাকরি পেয়েছেন পুলিশ ও সেনাবাহিনীতে। জুমা চাকমার গল্পটাও একই রকম। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে গত বছর ঢাকা লিগে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন এই ব্যাটার-উইকেটকিপার। তিনি বললেন, ‘তনয় স্যার না থাকলে এত দূর আসা সম্ভব হতো না।' নিশিতা চাকমা খেলেছেন ইন্দিরা রোড ক্রিকেট একাডেমির হয়ে। তিনি বললেন, 'তনয় স্যার আমাদের স্বপ্ন দেখিয়েছেন। আমি একদিন বাংলাদেশের হয়ে খেলতে চাই।'

তনয় নিজে আরো আশাবাদী, জুরাছড়ির মেয়েদের সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে। পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আগামী কয়েক বছরে জাতীয় দলকে ভালো ক্রিকেটার উপহার দিতে পারব আমরা। জুরাছড়ি প্রমীলা ক্রিকেট একাডেমির একটা স্থায়ী ভিত্তি চাই।'