ক্যউপ্রু মার্মা। পার্বত্য জেলা বান্দরবানের ছেলে। মেলা থেকে কেনা একটি বাঁশিই তার জীবনের রঙ পাল্টে দিয়েছে। তার সেই বাঁশির সুরে মজেছেন নেটিজেনরা। সম্প্রতি ক্যউপ্রুর বাঁশি বাজানোর একটি ভিডিও প্রায় ৪ লাখ দর্শক দেখেছেন। প্রায় ৪ হাজার বার শেয়ার হয়েছে ভিডিওটি।
বান্দরবানের রুমা উপজেলার থানাপাড়া এলাকায় ২০০২ সালের ১ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন ক্যউক্র। জন্মের ২ বছর পর বাবা উসিংমং মার্মাকে হারান ক্যউথ্রু। মা মামুইনু মার্মার সঙ্গে শুরু হয় শিশু ক্যউপ্রু সংগ্রামের পথচলা। ছেলের বেড়ে ওঠাকে নির্বিঘ্ন করতে এক সময় তার মা তাকে বাধ্য হয়ে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন নামের একটি অনাথালয়ে ভর্তি করান। সেখানেই ক্যউপ্রু'র পড়ালেখা চলতে থাকে। পাঠ নেন বাংলার শুদ্ধ উচ্চারণের, যুক্ত হন ফাউন্ডেশনের সাংস্কৃতিক শাখায় । সেখানেই নেন গানের হাতে খড়ি। তার আগ্রহ জন্মায় গান ও চলচ্চিত্রে। ফাউন্ডেশনে পরিচয় হয় শিক্ষক আনোয়ার আল হকের সঙ্গে। একদিন আগুনে পুড়ে যায় ক্যউপ্রুর ঘর।
সহায় সম্বলহীন ক্যউপ্রুকে আর্থিকসহ সবরকম সহায়তা করেন তিনি। ক্যউপ্রু জানান, এখনও পর্যন্ত আনোয়ার স্যার তাকে প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং দিক নির্দেশনা দিয়ে তার পাশে রয়েছেন। আনোয়ার আল হক বলেন, 'ওর মা ওকে একজন প্রতিবেশীর মাধ্যমে ফাউন্ডেশনে পাঠিয়েছিলেন। তখন ও ছিলো আড়াই বছরের ফুটফুটে শিশু। ছোটবেলা থেকেই সে এতো চটপটে ছিলো যে, আমি বুঝতে পেরেছিলাম ওর মধ্যে ভবিষ্যতে ভালো কিছু করার সামর্থ্য আছে। যাকে বলে 'মর্নিং শোজ দ্যা ডে'। ওর গান ফাউন্ডেশনে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। ওর জন্য অনেকেই ফাউন্ডেশনে ডোনেট করতো। এসএসসিতে বিজ্ঞান বিভাগে সে ৪.৬৫ পয়েন্ট পেয়েছিলো। বাবা ম্যালেরিয়ায় মারা যাওয়ার পর ক্যউপ্রু'র ইচ্ছে ছিলো ডাক্তার হবে। কিন্তু এইচএসসিতে পয়েন্ট কিছু কম (৩.৬৭) থাকায় আর মেডিক্যাল পড়া তার হয়নি। এখন সে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগে পড়াশোনা করছে। বাঁশির প্রতি তার বেশ আগ্রহ দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমি ওর একজন অভিভাবক হিসেবে চাই, সে পড়ালেখাটা ভালোভাবে সম্পন্ন করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করুক। ওর মায়ের জন্য, নিজের জন্য একটি মজবুত অবস্থান তৈরি করুক। পাশাপাশি বাঁশি বাজানোটা চালিয়ে যাক, তাতে অসুবিধে নেই। কিন্তু জনপ্রিয়তায় গা ভাসিয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই পৃথিবীতে পড়ালেখাকে যেন অবহেলা না করে । কারণ,আমি তো চিরদিন থাকবোনা ওর পাশে। ও যাতে বিপথে না যায়, এ ব্যাপারে ওকেই সচেতন থাকতে হবে।'
এদিকে এসএসসির পর ক্যউগ্রু'র সংগীতের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। নিজ উদ্যোগে শিখতে থাকেন সংগীতের বিভিন্ন বিভাগের খুঁটিনাটি। আনোয়ার স্যারের সহায়তায় ভর্তি হন বরিশাল সিটি কলেজে। সেখানে পরিচিত হন গ্রন্থাগারের মাসুম উজ জামান স্যারের সাথে। বরিশালে মাসুম স্যারের সহায়তায় এগিয়ে চলে ক্যউপ্রু'র পড়ালেখা।
২০১৮ সালে কলেজে পড়াকালীন বরিশালে তাঁতবস্ত্র শিল্প মেলা থেকে ৪০ টাকা দামের একটি বাঁশি কিনে নেন ক্যউপ্রু। ওটা নিয়েই প্রথম বাঁশি বাজানোর চেষ্টা শুরু করেন তিনি।

এরপর যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেন তখন বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেন নাট্যকলাকে । ক্যউগ্রু জানান, তিনি নাট্যকলাকে এমন একটা বিষয় হিসেব আবিষ্কার করেছেন, যেখানে শিল্পের সকল শাখার সমন্বয় ঘটে। তাই গানের পাশাপাশি অভিনয় শিল্পের মতো শিল্পকলার ভিন্ন একটি শাখাকে জানার এবং বোঝার আগ্রহ থেকে ভর্তি হন নাট্যকলা বিভাগে। সেখানে ক্যউপর বাঁশির বাজানোর ঝোঁক বুঝতে পারেন বিভাগের শিক্ষক ফারজানা আফরিন। তখন প্রথম বর্ষের ক্যউপ্রুকে মাস্টার্সের সিলেবাসের সেলিম আল দীনের 'যৈবতী কন্যার মন' নাটকে বাঁশি বাজানোর দায়িত্ব দেন তিনি। অনুশীলনের পর নাটক মঞ্চস্থ হলে সকলের প্রশংসায় ভাসেন ক্যউপ্রু। সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা মেলে বাঁশি বাজানোর।
কিন্তু ভর্তি হওয়ার কিছুদিন পর করোনার থাবায় বন্ধ হয়ে যায় বিশ্ববিদ্যালয়। বাধ্য হয়ে ক্যউগ্রুকে চবি থেকে পাড়ি জমাতে হয় বান্দরবানে। সেখানে মায়ের সঙ্গে জুম চাষের কাজে লেগে পড়েন। অবসরের সঙ্গী হয় বাঁশি। বাঁশির সঙ্গে ক্রমে সখ্য বাড়ে ক্যউপ্রুর। রীতিমতো গবেষণায় নেমে পড়েন বাঁশিকে বাগে আনতে। চেষ্টা চলে তাতে সুর ও আবেগের সমন্বয় ঘটানোর। দেখতে থাকেন একের পর এক টিউটোরিয়াল । করোনা কালের এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পর ২০২১ সালের শুরুতে ক্যউপ্রু প্রথম অ্যাপের সহায়তায় একটি হিন্দি গানের বাঁশি কাভার করেন। কাজ শেষে ফিরে যখন মুঠোফোন চেক করেন রীতিমতো হতবাক হয়ে যান। ক্যউপ্রু বাঁশির সেই অডিও নেটিজেনদের লাইক কমেন্টে ভরে ওঠে। নোটিফিকেশনের বন্যায় ভেসে যায় ক্যউগ্রুর মুঠোফোন।
এরপরই এক বন্ধু ক্যউপ্রুকে পরামর্শ দেন ফেসবুকে নিজের একটি পেইজ খোলার। সেই অনুযায়ী ইংরেজি বর্ণে নিজ নামে খোলা সেই পেইজটিতে আপলোড করতে থাকেন বাঁশির ভিডিওগুলো। তবে ক্যউপ্রুকে তার ভিডিওর উপস্থাপনা, ধারাবাহিকতাসহ পেইজ পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে শ্রোতা এবং দর্শকদের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য করে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেন তারই বিভাগের সিনিয়র মামুন খান মোনায়েম। আর মোনায়েমের পরামর্শ অনুযায়ীই এগোতে থাকেন ক্যউপ্রু।
পাশাপাশি চালিয়ে যেতে থাকেন বাঁশির অনুশীলন । অনুসরণ করেন বিখ্যাত বাঁশি বাদক হরিপ্রসাদ চৌরাশীয়া, রাকেশ চৌরাশীয়া, প্রাভিন গৌরখন্ডি এবং পানেশ নাথের বাজানো। ক্যউপ্রুকে সংগীতের বাদ্যযন্ত্র দিয়ে সহায়তা করেন চট্টগ্রামের অ্যাকোস্টিকা শপের মানিক জসিম । ক্যউপ্রু'র মতে, এই অসাধারণ আন্তরিক মানুষগুলো না থাকলে আরো দুর্বিষহ হতে পারতো পথচলা।
সবশেষে চলতি বছরের ২৬ অক্টোবর ক্যউপ্রু'র একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। যেখানে সাঙ্গু নদীর পাড়ে জুমে যাওয়ার সময় নৌকার অপেক্ষায় থাকার সময় মাকে সঙ্গে নিয়ে বাঁশি বাজাতে দেখা যায় ক্যউপ্রুকে। পাহাড়ের গা ঘেঁষে সাঙ্গু নদীর বয়ে চলা, সাঙ্গুর পানিতে সূর্যের আলোর ঝলকানি, মায়ের উপস্থিতি এবং ছেলের হৃদয়হরণকারী বাঁশির সুর এক নৈসর্গিক পরিবেশের সৃষ্টি করে। যা মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে নেট দুনিয়ায় এবং সেই সঙ্গে মেলে শ্রোতা-দর্শকদের অকুন্ঠ ভালোবাসা।
দুর্বিষহ অনিশ্চিত জীবনের হতাশা থেকে বাঁশিকে সঙ্গী করে নিলেও ক্যউপ্রুর মুখের হাসির নেপথ্যেও এখন বাঁশি । কেননা, বাঁশিতেই আনন্দ খুঁজে পান ক্যউণ্ড।
ক্যউপ্রু মার্মা বলেন, 'বাঁশিকে আমার কাছে মনে হয়েছে এমন একটা যন্ত্র যাতে কোনো কৃত্রিম কিছু সংযুক্ত নেই। এটি কেবলই একটি বাঁশের তৈরি বাঁশি । যা আমার ফুঁ'র ফলে কম্পনের তরঙ্গের মাধ্যমে সুর তৈরি করে অন্যদের হৃদয়ে সাথে সংযোগ সৃষ্টি করে। হৃদয়ের সঙ্গে সংযোগ সৃষ্টির এ ব্যাপরটা কেবল বাঁশির মাধ্যমেই সম্ভব ।
-পার্বত্য সময়

