তৎকালীন সরকার দেশের মানুষের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলায় ১৯৬২ সালে কর্ণফুলী নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ করে দেশের সর্বপ্রথম ও বৃহত্তম জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেছিল। বাঁধ নির্মাণ হওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তর মিঠাপানির কৃত্রিম কাপ্তাই হ্রদের সৃষ্টি হয়।

কাপ্তাই উপজেলা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও উপজেলাটির কাপ্তাই এবং চিৎমরম দু’টি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের কয়েকশো পরিবার এখনো বিদ্যুতের আলোর মুখ দেখেনি। অর্থাৎ এ যেন প্রদীপের নিচে অন্ধকার। বিদ্যুতের আলো না পৌছায় দেশের আধুনিক সকল সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এসব জনপদে বসবাসরত বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কাপ্তাই ইউনিয়নের ১, ২, ও ৩নং ওয়ার্ডের আওতাধীন গোলাবারুদ ছড়া,ভাইজ্যাতলী, হরিনাছড়াসহ বেশ কয়েকটি পাড়া মিলে ৫৬০টি পরিবারের বসবাস এবং চিৎমরম ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের আওতাধীন কলাবুনিয়া পাড়ায় অর্ধশতাধিক পরিবারের বসবাস। দু’টি ইউনিয়ন মিলে এসব জনপদে প্রায় ছয়শতাধিকের অধিক পরিবার এখনো বিদ্যুতের ছোঁয়া পায়নি।

এসব জনপদের বাসিন্দাদের রাতের অন্ধকার দূর করতে একমাত্র ভরসা ‘কুপি’ এবং ‘মোমবাতি’। বিদ্যুতের আলোর অভাবে এ অঞ্চলে বসবাসরত শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ বছর ধরে চরম কষ্টে দিন পার করছে। জনজীবনে নেই তেমন গতি।

স্থানীয়রা বলছেন, পুরো এলাকার বেশিরভাগ বাসিন্দারা হত দরিদ্র। তবে যারা একটু স্বাবলম্বী বাসিন্দা তারা কেবল সোলার প্যানেল ব্যবহার করে বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা পূরণ করছে।

চিৎমরম ইউনিয়নের কলাবুনিয়া পাড়ার বাসিন্দা সুচিং প্রু মারমা বলেন, ডিজিটাল যুগে এসেও আমাদের ছেলেমেয়েরা আলোর মুখ দেখছে না। এটা আমাদের জন্য দুঃখ ছাড়া আর কিছুই না।

কলাবুনিয়া পাড়ার হেডম্যান পাইংপ্রু অং মারমা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নেতাদের বড় বড় প্রতিশ্রুতি কেবল ভোট পাওয়ার আশ্বাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ভোট ফুরোলেই পাহাড়বাসীর এই কষ্টের কথা কেউ মনে রাখে না।

চিৎমরম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ওয়েশ্লিমং চৌধুরী বলেন, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে কলাবুনিয়া পাড়া অত্যন্ত কাছে হওয়ার পরেও এখানে বিদ্যুতের আলো পৌঁছানো যায়নি। বারবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেছি কিন্তু কোন সফলতা দেখছি না।

কাপ্তাই ইউনিয়নের ১,২,৩নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা ইউপি সদস্য ভানুমতি চাকমা বলেন, দীর্ঘ বছর ধরে এ এলাকায় বিদ্যুতের লাইন স্থাপনের জন্য দাবি জানিয়ে হতাশ হচ্ছি। এ অঞ্চলের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দূর করতে বিদ্যুতের বিকল্প নেই।

কাপ্তাই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী আব্দুল লতিফ বলেন, আধুনিক সভ্যতা গড়ে তুলতে হলে বিদ্যুতের খুবই প্রয়োজন। সরকারের কাছে এখনো দাবি জানাচ্ছি এ জনপদের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে জরুরী ভিত্তিতে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করে দেয়।

রাঙামাটি বিদ্যুৎ বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী স্বাগত সরকার বলেন,বর্তমানে নতুন কোন সঞ্চালন লাইন দেওয়া হচ্ছে না। ২০২২ সালের পর আমরা কোথাও নতুন সঞ্চালন লাইন  দেয়নি।

প্রকৌশলী স্বাগত সরকার আরও বলেন, আমাদের একটি নতুন প্রকল্প একনেকে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রকল্পটি পাস হলে আমরা নতুন লাইন স্থাপন করতে পারবো। তবে যেসব গ্রাহক আবেদন করবেন তারা নতুন লাইনের আওতায় আসবেন।

উল্লেখ্য,কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপনের সময় তৎকালীন সরকার কথা দিয়েছিলেন অন্ধকার জনপদকে আলোকিত করতে এবং এ অঞ্চলে বসবাসরত বাসিন্দাদের উন্নত সভ্যতা প্রদানের লক্ষ্যে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে বিতরণ করবে। কিন্তু কর্তৃপক্ষ কথা রাখেনি।

সারাদেশের ন্যায় রাঙামাটি জেলার মানুষরা বিদ্যুৎ পেয়ে থাকে। তবে এ জেলায় যে পরিমাণ বিদ্যুৎ চাহিদা রয়েছে সেই পরিমাণে বিদ্যুৎ এ জেলার মানুষেরা ভোগ করতে পারছে না। যে কারণে রাঙামাটির বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় বসবাসরত অনেক বাসিন্দারা এখনো বিদ্যুতের আলোর দেখা পায়নি দশকের পর দশক ধরে।

অথচ এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি স্থাপনের সময় পুরো একটি অঞ্চল বিলীন হয়ে গিয়েছিল। লাখ লাখ মানুষ উদ্বাস্ত হয়েছিল। ফসলী জমি, ভূমি হারিয়ে ছিল কয়েক লাখ মানুষ। কিন্তু এত ত্যাগের পরও এখানকার মানুষেরা বিদ্যুতের সুবিধার লাগাম পায় না।