পাহাড় আর হ্রদের মিতালি, বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও নানা জনগোষ্ঠীর সহাবস্থানে সমৃদ্ধ পার্বত্য জেলা রাঙামাটি। এ জেলার মানুষের জীবনযাত্রা, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য প্রচ্ছিবি দেখা যায় সাপ্তাহিক হাটগুলোতে। শনিবার এবং বুধবার জুমে উৎপাদিত হরেকরকম সবজি, ফলমূল নিয়ে জেলা শহরের কলেজ গেইট-সদর হাসপাতালের আধা কিলোমিটার সড়ক জুড়ে হাট বসে। এ হাটে পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদ থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে নিজেদের উৎপাদিত শাকসবজি, ফলমূল ও নানা কৃষিপণ্য নিয়ে হাজির হন পাহাড়ি নারী-পুরুষেরা। ভোর থেকেই ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে এ হাট।

নিজেদের উৎপাদিত শাকসবজি, ফলমূল ও নানা কৃষিপণ্য নিয়ে হাজির হন নারী-পুরুষেরা

চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাঙালিদেরও নিয়মিত উপস্থিতি রয়েছে এ বাজারে। ফলে বেচাকেনার পাশাপাশি এটি হয়ে উঠেছে পাহাড়ি-বাঙালির মিলনমেলা। কাপ্তাই হ্রদের তীরবর্তী কাইন্দ্যা, বন্দুকভাঙ্গা, বালুখালী, বসন্তপাড়া, মাইসছড়ি, নতুনপাড়া, কিল্লামুড়া, নানিয়ারচর ও বুড়িঘাটসহ বিভিন্ন গ্রাম থেকে বিক্রেতারা নৌকায় করে পণ্য নিয়ে আসেন।

বাজারজুড়ে চোখে পড়ে পাহাড়ে উৎপাদিত বাহারি শাকসবজি ও ফলমূলের সমাহার। সাবারাং পাতা, আমিলা গোটা, বাচ্চুরি বা বাঁশকোঁড়ল, মারফা, ধাইন্যা মরিচ, কচুর ছড়া, কলার থোড়, আলু শাক, কলমি শাক, জুম কুমড়া, জুমের বেগুন, জুমকচু, কলার মোচা, তিত বেগুন, বিলাতি ধনেপাতা, মূলা শাক, লাউ শাক, পুঁই পাতা, পুঁই ডাটা ও পুঁই বিচিসহ নানা পদের সবজি পাওয়া যায় এখানে। পাশাপাশি চিচিঙ্গা, কাঁচা-পাকা পেঁপে, কাঁচকলা, জাম্বুরা, আনারস ও কচি কাঁঠালও থাকে বিক্রির তালিকায়।

পণ্য ক্রয় করছেন একজন স্থানীয় ক্রেতা

এছাড়া ড্রাগন ফল, পাহাড়ি মাল্টা, জলপাই ও তেঁতুলসহ মৌসুমি ফলের সমারোহ রয়েছে। পাহাড়ে কলার উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে আলাদা কলার পসরা বসে, যেখানে বাংলা কলার প্রাধান্য দেখা যায়।

বিক্রি হয় কাপ্তাই হ্রদের মাছ, খামারে উৎপাদিত শূকরের মাংস, গরুর  দুধ, বাঁশের দইসহ নানা পণ্য। গ্রাম থেকে বোতলে করে আনা গরুর দুধেরও বেশ চাহিদা রয়েছে।

প্রতিটি গ্রাম থেকে হাটের দিনে ২০-৩০টি ইঞ্জিনচালিত নৌকা আসে। একটি নৌকায় গ্রামের ১৫-২০ জন মিলে পণ্য নিয়ে বাজারে আসেন। বিক্রেতাদের মধ্যে নারীদের সংখ্যাই বেশি। মৌসুম অনুযায়ী জুমে উৎপাদিত ফসল সংগ্রহ করে তাঁরা বাজারে বিক্রি করেন।

বেচা-কেনায় ব্যস্ত ক্রেতা-নারীরা

হাটে জুমের লাউ বিক্রি হচ্ছে পিস প্রতি ৩০টাকায়। বড় কচু কেজি প্রতি ৭০টাকা, মূলা শাক এবং লাল শাক প্রতি আঁটি ৩০টাকা, কলার মোচা পিস প্রতি ২০টাকা এবং ধাইন্যা মরিচ কেজিতে বিক্রি হচ্ছে ২০০টাকায়। এ হাটে বাজার করতে চাইলে ভোরে আসতে হবে এবং পছন্দ অনুযায়ী দরদাম করে নিতে হবে।

হাটের ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি হাটের দিন এ বাজারে প্রায় ১০-১৫ লাখ টাকার পণ্য বাণিজ্য করা হয়।

বিক্রেতা ননীবালা চাকমা বলেন, তিনি শামুক, মহিষের চামড়া ও ক্ষীরা বিক্রি করছেন।  শামুক প্রতি কেজি ২৫০ টাকা, মহিষের চামড়া ২০০ টাকা এবং ক্ষীরা ৮০ টাকা দরে বিক্রি করছেন।

ক্রেতা আব্দুল খালেক বলেন, এ হাটে বিষমুক্ত ফলমূল  ও সবজি পাওয়া যায়। তাই পরিবারের জন্য বাজার করতে এসেছি।

পেঁপে

ক্রেতা নুরুল আবছার বলেন, পরিবারের সদস্যদের জন্য  জুমের বড় কচু, লাউ এবং মিষ্টি কুমড়া কিনেছি। তরতাজা এবং বিষমুক্ত হওয়ায় এ সবজি খেতে অনেক সুস্বাদু।

জুমের টাটকা শাকসবজি ও ফলমূল কিনতে স্থানীয়দের পাশাপাশি জেলার বাইরের পাইকাররাও এ বাজারে আসেন। ক্রেতাদের মতে, হাটের দিনে তুলনামূলক কম দামে তাজা পণ্য পাওয়া যায়। অনেকের কাছে এসব পণ্যের বিশেষ আকর্ষণ হলো নিজস্ব উৎপাদন ও রাসায়নিক ব্যবহার না করার বিষয়টি।

পাহাড়ে উৎপাদিত টাটকা শাক-সবজি

বহু বছর ধরে সড়কের পাসে বসা পাহাড়ি এ হাটটি শুধু কেনাবেচার জায়গা নয়; পাহাড়ের কৃষি, নারীর শ্রম , স্থানীয় অর্থনীতি ও বহুজাতিক জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক সম্প্রীতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।