পাহাড়ের মেঘ, সবুজ অরণ্য আর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র সাজেক এখন যেন এক জনপদের দীর্ঘশ্বাস। সশস্ত্র তৎপরতা, নিরাপত্তাহীনতা ও বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে দফায় দফায় সড়ক অবরোধে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক। এবার চতুর্থ দফায় অনির্দিষ্টকালের অবরোধে বন্ধ হয়ে গেছে পর্যটকদের যাতায়াত। স্থবির পর্যটন, পরিবহন ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের সংকট, কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে না পারা এবং আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সোমবার (০২ নভেম্বর) সকাল ৬টা থেকে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের ডাকে নতুন করে অনির্দিষ্টকালের অবরোধ শুরু হয়েছে। পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংগঠন দুটি। এর আগে গত ২২ অক্টোবর থেকে টানা অবরোধ চলে। ১ নভেম্বর স্থানীয়দের খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের সুবিধার্থে ১২ ঘণ্টার জন্য কর্মসূচি শিথিল করা হলেও খাগড়াছড়ি পরিবহন শ্রমিক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির পাল্টা অবরোধে সেদিনও যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।

অবরোধকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে—সাজেক থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যদের সরিয়ে নেওয়া, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ, ২২ অক্টোবরের ঘটনার বিচার, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ এবং আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন।

আলোচনাতেও মেলেনি সমাধান

সংকট নিরসনে গত ২৬ অক্টোবর সাজেকের উজোবাজারে বৈঠকে বসেন খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটির সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান, দুই জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বৈঠকে পাঁচ দফা দাবির চারটি বিষয়ে সমঝোতা হলেও সশস্ত্র জেএসএস সদস্যদের প্রত্যাহারের দাবিতে মতৈক্য হয়নি। ফলে অমীমাংসিত থেকে যায় সংকট।

এদিকে সংকট নিরসনে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে গঠিত তিন সদস্যের কমিটিতে রয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম হেডম্যান নেটওয়ার্কের সহসভাপতি ভবতোষ দেওয়ান, সাধারণ সম্পাদক শান্তি বিজয় চাকমা ও হেডম্যান কল্যাণ মিত্র চাকমা। কমিটির সদস্য শান্তি বিজয় চাকমা বলেন, স্থানীয় হেডম্যান ও কারবারিদের সঙ্গে মতবিনিময় করে প্রশাসনের কাছে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সমন্বয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ বের করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানান, অবরোধের কারণে সড়কে বড় ধরনের যানবাহন চলাচল করছে না। তবে মাঝেমধ্যে অটোরিকশা, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মোটরসাইকেল চলাচল করছে। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

প্রতিদিন আড়াই কোটি টাকা পর্যন্ত ক্ষতির আশঙ্কা

সাজেকের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি পর্যটন। রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ, চাঁদের গাড়ি, জিপ, সিএনজি, দোকানপাট ও পর্যটকসেবার সঙ্গে জড়িত কয়েক হাজার মানুষের জীবিকা এ খাতের ওপর নির্ভরশীল। সাজেক বন্ধ থাকায় পর্যটন খাতে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

সাজেকে বর্তমানে ১০৮টি রিসোর্ট চালু রয়েছে। নতুন করে নির্মাণাধীন ১৯টি এবং বন্ধ রয়েছে ২৬টি। চালু থাকা রিসোর্ট ও ২১টি রেস্তোরাঁয় কর্মরত প্রায় এক হাজার কর্মচারীর বেতন ও পরিচালন ব্যয় বহন করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। অথচ পর্যটক না থাকায় আয় প্রায় বন্ধ।

সাজেকের রুইলুই রিসোর্টের পরিচালক মিশু দে বলেন, তাঁর রিসোর্টের ২২টি কক্ষ পূজার ছুটিতে শতভাগ বুকিং ছিল। অবরোধের কারণে ২২ অক্টোবর থেকে সব বুকিং বাতিল হয়েছে। পর্যটন ব্যবসায় ধস নামলে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ কে দেবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

পরিবহন খাতেও একই চিত্র। সাজেক-খাগড়াছড়ি সড়কে প্রতিদিন প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি জিপ এবং ৫০ থেকে ৬০টি সিএনজি ও মাহিন্দ্র চলাচল করে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। মাহিন্দ্রচালক মো. জসিম উদ্দিন জানান, অবরোধের প্রথম আট দিনেই তাঁর প্রায় ২৫ হাজার টাকার আয় বন্ধ হয়েছে। সাজেক পরিবহন কাউন্টারের ব্যবস্থাপক মো. আরিফের ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যটক পরিবহনে যুক্ত শত শত শ্রমিক এখন কার্যত বেকার।

খাদ্যসংকট, কৃষকেরও লোকসান

সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে স্থানীয় জনজীবনে। টানা ১২ দিনের অবরোধে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। স্থানীয় কৃষকের উৎপাদিত কলা, সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নেওয়া যাচ্ছে না। ফলে একদিকে পণ্য সরবরাহে সংকট, অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে না পেরে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।

সাজেক রিসোর্ট এন্ড কটেজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন বলেন, অবরোধে পর্যটন ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। স্থানীয়দের খাদ্য ও কৃষিপণ্য নিয়েও সংকট তৈরি হয়েছে। দ্রুত সমাধান প্রয়োজন।

সাজেকের ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য অনিত্য ত্রিপুরাও পর্যটননির্ভর মানুষের জীবিকা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, পর্যটক না আসায় রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলো আয়-রোজগারের সংকটে পড়ছে।

সমাধান কোথায়?

সাজেকের সংকট এখন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিরোধের গণ্ডি ছাড়িয়ে খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক অর্থনীতির প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই এমন অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে ক্ষতির বোঝা আরও বাড়বে। বিশেষ করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির পর্যটন, পরিবহন এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অবরোধ প্রত্যাহারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহের বিকল্প ব্যবস্থা, কৃষিপণ্য পরিবহনে বাধাহীন সুযোগ এবং অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, আন্দোলনকারী সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কার্যকর আলোচনাই পারে এ অচলাবস্থা কাটাতে। পাহাড়ের পর্যটন অর্থনীতি বাঁচাতে এখন সবচেয়ে জরুরি মানুষের নিরাপত্তা, স্বাভাবিক যোগাযোগ ও আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা।