২০২২ সালের শুরুর দিক থেকে ফেসবুকে পাহাড়ের ৯ উপজেলা নিয়ে পৃথক রাজ্যের ঘোষণা দেয় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (কেএনএফ)। পাহাড়ে নানা আঞ্চলিক দলের আধিপত্য বিস্তারের খবরের মধ্যেই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে এই নতুন সংগঠন। শুরু থেকেই নানা বিতর্ক ও অন্তর্দ্বন্দ্ব অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেয় এ সংগঠনকে। সম্প্রতি নেতৃত্ব সংকট নিয়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আরও কিছু ভয়াবহ তথ্য। 
শুরুতে কেএনএফ'র নেতৃত্ব দিয়েছে প্রতিষ্ঠাতা নাথান লনচেও বম। সে মূলত সন্তু লারমার জেএসএস থেকে বের হয়ে বম জাতিগোষ্ঠীর কিছু সদস্যকে নিয়ে নাথান বম সশস্ত্র সংগঠনটি তৈরি করেন। যে কারণে এটি বম বাহিনী নামেও পরিচিত। তবে কেএনএফ দাবি করছে, রাঙামাটি ও বান্দরবান অঞ্চলের ছয়টি জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছে তারা।  সেগুলো হলো বম, পাংখোয়া, লুসাই, খিয়াং, ম্রো ও খুমি। যদিও সংবাদ সম্মেলনে অন্য জাতিগোষ্ঠীর নেতারা জানিয়েছেন, তারা কেএনএফ'র সঙ্গে নেই।
তাদের দাবি করা অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে নাথান বমকে দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে তার অনুপস্থিতি প্রশ্নের জন্ম দেয় সংগঠনের ভেতরেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কেএনএফ'র বান্দরবানের রুমা এলাকার এক কালেক্টর (চাঁদা সংগ্রহকারী) জানান, "না, না! তিনি সামান্য অসুস্থ্য বলে শুনেছি। তিনি চিকিৎসার জন্য বিশ্রামে আছেন।"
কোথায় চিকিৎসা নিচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলতে রাজি হননি। তবে তাকে দেখেননি বলেন জানান তিনি। 
এই কালেক্টর বলেন, এখানে পরিবার ও তাদের অবস্থা (অর্থনৈতিক) বিবেচনা করে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদার রেট করা আছে। আমরা শুধু চিনচির বমের (লালমুন ঠিয়াল, ৫২) নির্দেশে চাঁদা সংগ্রহ করি।
তবে বাঘাইছড়িতে চাঁদা সংগ্রহ হয় ভাং চুন লিয়ানের নির্দেশে বলে জানান ওই এলাকার এক কালেক্টর। তিনি বলেন, ভাং চুন লিয়ানই কেএনএফ চালাচ্ছে। তার কথাতেই সব হয়। নাথান বম তাকেই তার পরবর্তী দায়িত্ব দিয়ে গেছেন। 
নাথান বম কেন দায়িত্বে নাই জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার কথা কেউ শুনতে চায় না। সে নতুন সংগঠন করার কথাও চিন্তা করছে বলে জানান বাঘাইছড়ির ওই কালেক্টর।
এদিকে কেএনএফ'র অপারেশন ইনচার্জের দায়িত্বে থাকে লালরাম (কুকি রাম) এর এক ঘনিষ্ঠজন দাবি করেন, নাথান বমের প্রথম পছন্দ ছিল কুকি দাদা (লালরাম)। লিয়ান নিজে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তার অনুসারীদের নিয়ে কেএনএ (কুকি-চিন ন্যাশনাল আর্মি) নাম করে আলাদাভাবে নিজেদের পরিচিতি আনতে চায়। 
তিনি বলেন, কুকি দাদার ইচ্ছে ছিল সরকারের সাথে একটা আলোচনার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে। বমদের উন্নতি হবে এমন শর্ত দিয়ে আপাতত পাহাড়ে শান্তি ফিরিয়ে আনা। 
তার বক্তব্য, কুকি দাদার সাথে মুইয়া বমও (মিডিয়া অফিসার) একমত ছিল। কিন্তু চিনচির বম ও লিয়ান দুজনে দু'দলে বিভক্ত হয়ে চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছে। কুকি দাদা এখনও চেষ্টা করছে সরকারের সাথে বসে আলোচনা করতে।
নাথান বমের অবস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, কুকি দাদারাও জানে না আসলে সে কই আছে। ভাং চুন লিয়ান তাকে (নাথানকে) নিজেদের জিম্মায় রেখেছে বলে জেনেছি। এ নিয়ে চিনচিরের সাথে বিবাদও চলে। কুকি দাদারা চাচ্ছে নাথানকে উদ্ধার করে সরকারের সাথে বসে এ ঝামেলা শেষ করতে। যদি বেঁচে থাকে তাহলে নাথানকে উদ্ধার করা গেলেই এ সমস্যার সমাধান হবে।
সাংবাদিক ও বিশ্লেষক হাসান হাবীব বলেন, শুরু থেকে দেখবেন, কেএনএফ সরকারের কোনো দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নয়, সমস্ত ক্ষোভ আঞ্চলিক পরিষদ, জেএসএস এবং চাকমাদের ওপর চাপায়। এই তিনটি ছাড়া তাদের ঘৃণার আর কোনো জায়গা ছিল না। বিভিন্ন মহল্লায় হামলা চালিয়ে চাকমাদের বিরুদ্ধে ‘প্রতিশোধ’ নেওয়ার নানা বার্তা তারা দিতে থাকে। তারা রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের একটি ত্রিপুরা গ্রামে দুজন জুমচাষিকে হত্যা এবং শিশুসহ কয়েকজনকে আহত করে।
তিনি বলেন, ‘ বর্তমানে কেএনএফ যা করছে, আসলে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে করেছে। তারা দিনদুপুরে ব্যাংক ডাকাতির করে, পাহাড়ের ভূমি কেনাবেচা বাঙালিসহ সবার জন্য অবারিত করে দেওয়ার সুযোগ রেখেছে। এগুলো সব দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য।’
তিনি আরও বলেন, তারা একের পর এক দাবি-দাওয়া পেশ করছে বিভিন্ন ফেসবুক পেজ -গ্রুপের মাধ্যমে। ভিন্ন ভিন্ন পেজ থেকে ভিন্ন ভিন্ন দাবি তারা করছে। সহজেই আঁচ করা যাচ্ছে তারা কোনো কনক্রিট পজিশনে (স্থায়ী অবস্থা) নেই। তাদের নেতৃত্ব নিয়ে একটা ঝামেলা হতে পারে বলে মনে হচ্ছে।
২০২২ অক্টোবরে জঙ্গিগোষ্ঠীকে সহযোগিতার অভিযোগ উঠলে কেএনএফের বিরুদ্ধে র‌্যাবের বিশেষ অভিযান শুরু হয়। এর মধ্যেই গত বছরের মে মাস থেকে শুরু হলো শান্তি আলোচনার উদ্যোগ। 
এরপর ‘রাজ্যের’ দাবি ছেড়ে কেএনএফ ছয় দফা দিয়ে নতুন আবদার করল বাঘাইছড়ি, জুরাছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি নিয়ে পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রণয়নসহ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল দেওয়ার। এই অঞ্চলের নামও তারা দিয়ে দেয়, ‘কুকি–চিন টেরিটোরিয়াল কাউন্সিল’ বা কেটিসি।
এভাবে সময় সময় বদলেছে কেএনএফ'র লক্ষ্য, পাল্টে গেছে তাদের দাবি। সুনির্দিষ্ট কোনো নেতাকেও সামনে থেকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়নি। 
কেএনএফের শর্ত, ‘কেটিসির যাবতীয় দাপ্তরিক কার্যাবলি কোনোভাবেই পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ বা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের আওতাধীন থাকিবে না।’ এখানেই শেষ নয়। কেএনএফ চায়, কেটিসির চেয়ারম্যান হবেন পূর্ণ মন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন।
কেএনএফ দাবি করে, ‘কুকি–চিন তথা বম, পাংখোয়া, লুসাই, খুমি, ম্রো ও খিয়াং জনগোষ্ঠীর মানুষ পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমিপুত্র। কিন্তু এই ভূখণ্ডে সরকার ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে বঞ্চনার শিকার।’
পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনাকেও পাল্টে দিতে চায় কেএনএফ। পুরো পার্বত্য চট্টগ্রাম সুদীর্ঘকাল ধরে চাকমা, বোমাং ও মং সার্কেলে বিভক্ত। তিন সার্কেল প্রধান বা রাজা সরকারের হয়ে রাজস্ব আদায় করেন। বাংলাদেশের ৬১ জেলা থেকে ভিন্ন এখানকার ভূমি ব্যবস্থাপনা আর সেটা আইনত স্বীকৃত। কিন্তু কেএনএফ চায়, ভূমিতে সার্কেল প্রধান বা মৌজার হেডম্যানদের কোনো ক্ষমতা থাকবে না।
-পার্বত্য সময়