সবুজ রূপ বৈচিত্রের শ্যামল ভূমি পার্বত্য রাঙামাটি। নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যরে অনুপম আধাঁরের রাঙামাটি জেলা তার বৈচিত্র্যময়তার কারণে আকর্ষণীয় স্থান হিসাবে দেশী-বিদেশি পর্যটকদের মনে স্থান করে নিলেও অপার সম্ভাবনাময় দেশের একদশমাংশ এলাকা নিয়ে গঠিত হ্রদ পাহাড়ের পার্বত্য রাঙামাটি বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বের সীমান্তবর্তী অন্যতম বড় জেলা। একই সঙ্গে পর্যটনের জন্য ব্যাপক সম্ভাবনা গড়ে উঠতে পারে এই পার্বত্য জেলায়।
কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও সদিচ্ছার অভাবে এখনো পর্যটনশিল্পে পিছিয়ে রয়েছে এই পার্বত্য জেলা রাঙামাটি। শহরের একমাত্র ঝুলন্ত সেতু ও পুলিশের পলওয়েল পার্ক ছাড়া এখন পর্যন্ত তেমন পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ হয়নি সেখানে।
স্থানীয়রা বলছেন, পার্বত্য জেলা পরিষদ চাইলে রাঙামাটির পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন করা সম্ভব হতো।
২০১৭ সালে তৎকালীন রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বৃষকেতু চাকমা ও বর্তমান চেয়ারম্যান অংসুই প্রু চৌধুরী জানিয়েছিলেন, রাঙামাটির পর্যটন শিল্পে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পের কথা। সেই মেগা প্রকল্প এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। দীর্ঘ ছয় বছর পরও এখনো দৃশ্যমান নয় সেই কাঙ্ক্ষিত মেগা প্রকল্প।
১৯৮৬ সালে রাঙামাটির তবলছড়িতে দুই পাহাড়ের মাঝখানে ৩৩৫ ফুট দীর্ঘ প্রথম ঝুলন্ত সেতু নির্মাণ করে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন। পর্যটকদের কাছে এ সেতু ‘সিম্বল অব রাঙামাটি’ হিসেবে বেশ পরিচিত। এ সেতুর সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক আসেন রাঙামাটিতে। তবে কাপ্তাই হ্রদের বুকে অপরিকল্পিতভাবে সেতুটি নির্মাণের ফলে প্রতি বর্ষার মৌসুমে পানিতে ডুবে থাকে এ ঝুলন্ত সেতুটি।
অন্যদিকে ৩৩ বছর পরে রাঙামাটি জেলা পুলিশের তত্ত্বাবধানে জেলা শহরে ২০১৯ সালে নির্মিত হয় ‘পলওয়েল পার্ক’। ঝুলন্ত সেতু ও পলওয়েল পার্ক ছাড়া রাঙামাটিতে যেসব রিসোর্ট ও কটেজ নির্মাণ করা হয়েছে সেগুলোও রেস্টুরেন্ট ভিত্তিক এবং ব্যক্তি মালিকাধীন। বর্তমানে আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়কের ১৮ কিলোমিটার রাস্তা স্থানীয় ও বাইরের পর্যটকদের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
স্থানীয়রা মনে করছেন, জেলা পরিষদ ও প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় ও পরিকল্পনা থাকলে পর্যটন খাত অনেক এগিয়ে যেত। রাঙামাটিতে সারা বছর পর্যটক ধরে রাখতে ক্যাবল কার, শিশু পার্কসহ বিভিন্ন রাইড স্থাপন, পর্যটন স্পটগুলোর সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা বাড়িয়ে আরো আকর্ষণীয় করা গেলে সারা বছর পর্যটক ধরে রাখা সম্ভব।
রাঙামাটির পর্যটন কেন্দ্র ও ঝুলন্ত সেতুতে সরেজমিনে গেলে ঢাকা চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে ঘুরতে আসা পর্যটকরা হতাশার গল্প শোনান। রাঙামাটি শহরের আসামবস্তি-কাপ্তাই সড়কের দিকে মালিকানাধীন যে কয়েকটি রিসোর্ট গড়ে উঠেছে সেগুলোয় রাত্রিযাপন করতে গেলে প্রতি রাতে গুণতে হয় ৫ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা। অন্যদিকে সাজেক ভ্যালি যেতে হয় পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি দিয়ে। সরকারিভাবে যদি কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি আর মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশের সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণ করা যায় তাহলে এখান থেকে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যটক ও স্থানীয়রা।
লংগদু উপজেলা থেকে পর্যটন ঝুলন্ত সেতুতে ঘুরতে আসা মো. আজগর বলেন,‘তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর রাঙামাটি জেলা। এখানে প্রচুর পরিমাণে পর্যটনশিল্পে সম্ভাবনা আছে। আমাদের এখানে যদি পর্যটন ক্ষেত্রে আরেকটু উন্নয়ন হয় তাহলে প্রচুর পর্যটক আসবে। এখান থেকে সরকারের প্রচুর রাজস্ব আয় সম্ভব হবে। চট্টগ্রাম থেকে ঘুরতে আসা এক পর্যটক বলেন, চট্টগ্রাম থেকে রাঙামাটি আসছি। এখানে পর্যটন ঝুলন্ত সেতু এবং পলওয়েল পার্ক বাদে তেমন পর্যটনস্পট দেখলাম না।
সারা বাংলাদেশে উন্নয়নের যে ধারাবাহিকতা সেভাবে উন্নয়নের ছোঁয়া রাঙামাটিতে পড়েনি। রাঙামাটিতে উন্নয়নের ছোঁয়া পড়ার জন্য নগর পরিকল্পনা দরকার। এখানে যা কিছু স্থাপিত হয়েছে সবগুলো অপরিকল্পিত।’
পর্যটনশিল্পে যদি উন্নয়ন করতে সরকারকে আরো মনোযোগ দিতে হবে। এখানে যারা পর্যটন নিয়ে কাজ করেন তাদের মতামত নিতে হবে। রাঙামাটির পর্যটনশিল্পকে যদি সত্যিকার অর্থে বিকশিত করা যেত তাহলে এখানে যারা সাধারণ নাগরিক আছে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে আরো ডেভেলপ হতো।
রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক খোকেনশ্বর ত্রিপুরা বলেন, ‘ছোট ছোট কতগুলো পরিকল্পনা দরকার। তবে প্রথমে এখানকার একটিভিটিগুলো বাড়াতে হবে। রাঙামাটির সঙ্গে কম্পেয়ার করলে কাশ্মীরের ডাল লেক কিছুই না। কাশ্মীরে ছোট ছোট ওয়াটারব্যাচ নৌকা আছে। যেমনটা রাঙামাটিতে কয়েকজনে কায়াকিংয়ের ব্যবস্থা করেছে। এ ছাড়া রাঙামাটি শহরকে যদি আমরা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে পারি এটাও আমাদের ব্র্যান্ডিং হতে পারে।’
রাঙামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ইউনিট ব্যবস্থাপক (উপব্যবস্থাপক) আলোক বিকাশ চাকমা বলেন,‘পর্যটকদের সুবিধার জন্য পর্যটন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। আশা রাখি আমরা এর একটি সুফল দেখতে পাব। এ ছাড়া বর্তমান ঝুলন্ত ব্রিজের আদলে আরো আধুনিক ঝুলন্ত ব্রিজ তৈরি করার জন্য প্রধান কার্যালয়ে আমাদের একটি প্রস্তাবনা দেওয়া আছে। সে প্রস্তাবনা যদি বাস্তবায়ন হয় তাহলে এ এলাকার পর্যটনশিল্প এগিয়ে যাবে।’
রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অংসুই প্রু চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের একটি মেগা প্রকল্প ছিল। সেই মেগা প্রকল্প এখনো পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন আছে। আমরা মিটিং করে যাচ্ছি প্রকল্পটি যেন পাস হয়। পর্যটন সেক্টরকে কীভাবে শৃঙ্খলা আরেকটু সুশৃঙ্খল আরো একটু সৌন্দর্য বাড়ানো যায় এবং কীভাবে সিস্টেমে আনা যায় সে লক্ষ্যে একটি মিটিং করব।’
বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনা বিরাজমান। কিন্তু বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সঠিক কর্মপরিকল্পনার অভাবে আমরা পর্যটন শিল্পে অনেক পিছিয়ে আছি। এই শিল্পের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু ও সমন্বিত পরিকল্পনা। পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল পক্ষকে নিয়ে একসঙ্গে কাজ করে যেতে হবে। দেশীয় পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি বিদেশী পর্যটক আকর্ষণে প্রচারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করতে হবে।
পাশাপাশি এই শিল্পের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পেশাদার দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির দিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। সঠিক কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে পর্যটন শিল্প অন্যতম নিয়ামক ভূমিকা পালন করতে পারবে।
-পার্বত্য সময়

