মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠকে এবার নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে ইরান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি সংকট। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে হরমুজ প্রণালি খুলতে চীনের সহায়তা চাইলে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভবত তাইওয়ান ইস্যুতে কিছু ছাড় দিতে হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি ট্রাম্প-শি বৈঠকের মূল আলোচ্য নয়। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে চীন ইরানকে চাপ দিয়ে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলতে সহায়তা করুক। তবে বেইজিং এই সংকটকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে পারে।
তাইওয়ানই চীনের প্রধান অগ্রাধিকার
বাউডইন কলেজের সরকার ও এশিয়ান স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ক্রিস্টোফার হার্লিন বলেন, চীনের কাছে তাইওয়ান প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে ট্রাম্প চাইবেন চীন যেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও বেশি সয়াবিন আমদানি করে।
চীন মধ্যপ্রাচ্য ও বিশেষ করে ইরানি তেলের বড় ক্রেতা। ফলে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে চীনের জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনীতি চাপে পড়তে পারে। তবুও বেইজিং এখন পর্যন্ত সরাসরি হস্তক্ষেপে অনীহা দেখিয়েছে।
সম্প্রতি চীন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আতিথ্য দিলেও এখনো তেহরানের ওপর প্রকাশ্য চাপ প্রয়োগ করেনি। বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প-শি বৈঠকের ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছে বেইজিং।
ইরান যুদ্ধে চাপে ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসন এখন চাপের মুখে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট প্রকাশ্যে চীনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন যেন তারা ইরানকে কূটনৈতিকভাবে চাপ দেয়।
তিনি বলেন, ‘চীন ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। এখন সময় এসেছে তারা কূটনৈতিকভাবে এগিয়ে আসুক।’
অন্যদিকে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তার চীনের সহায়তা প্রয়োজন নেই।
চীনের কৌশল: কূটনীতি বনাম সামরিক চাপ
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক উইলিয়াম ইয়াং বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন উভয়ই হরমুজ প্রণালি খুলতে চায়, কিন্তু তাদের পদ্ধতি ভিন্ন।
চীন শান্তি আলোচনা ও বহুপাক্ষিক কূটনীতির ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ ও হুমকি অব্যাহত রেখেছে।
এপ্রিল মাসে শি জিনপিং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির জন্য চার দফা পরিকল্পনা দেন। এতে ছিল—
* শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান
* জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান
* আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা
* উন্নয়ন ও নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য
গত সপ্তাহে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর চীন জানায়, তারা যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধান চায়।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ক আরও জটিল হতে পারে
গত কয়েক বছরে বাণিজ্য যুদ্ধ, দক্ষিণ চীন সাগর, কোভিড-১৯, তাইওয়ান এবং ‘স্পাই বেলুন’ ইস্যুতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক তীব্রভাবে অবনতি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান সংকট এখন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
চীন কী চাইতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হরমুজ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তা করলে চীন বিনিময়ে তাইওয়ান প্রশ্নে ছাড় চাইতে পারে।
বর্তমানে তাইওয়ানের জন্য ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রয় চুক্তি ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। চীন চাইছে যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি বাতিল করুক এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান থেকে সরে আসুক।
সিটি সেন্ট জর্জ’স ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ইন্দ্রজিৎ পারমার বলেন, ‘চীন এই সংকটকে তাইওয়ান প্রশ্নে কৌশলগত সুবিধা আদায়ের সুযোগ হিসেবে দেখছে।’


