দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় এককালের শয্যভাণ্ডার খ্যাত বার্মা এখন দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে। জাতিগত সহিংসতায় লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়েছে। অভ্যন্তরীণ যুদ্ধের কারণে মিয়ানমারের প্রায় সব অঞ্চলে বিরাজ করছে চরম খাদ্য পণ্য ও জ্বালানী সংকট। এ অবস্থায় দেশটির প্রতিবেশী চীন ও থাইল্যান্ড তাদের সীমান্তে কঠোরতা অবলম্বন করছে।
মিয়ানমারের অন্যতম প্রতিবেশী বাংলাদেশের উদারতার সুযোগে বরাবরের মতো বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানিকৃত জ্বালানী ও ভোজ্য তেলসহ জরুরি ভোগ্যপণ্য পাচার রোধ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
এমনিতে পুরো ২০২৩ সাল জুড়ে চরম অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক দুরাবস্থায় জ্বালানী সংকটে মিয়ানমারের শিল্প কারখানার উৎপাদন প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দেশটির স্থানীয় নীট সম্পদে টান চলছে। গত বছর দেশটি ২০ হাজার কিয়াটের নোট বাজারে ছেড়েও মুদ্রাস্ফীতি রোধ করতে পারছে না। প্রতিবেশী মিয়ানমারের - সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক টালমাটাল অবস্থায় বাংলাদেশের মাদক কারবারীরা দেদারসে মাদকের চালানের বিনিময়ে পাচার করছে বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা জরুরি পণ্য জ্বালানী ও ভোজ্য তেল, ঔষধসহ নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রী।
বাংলাদেশী আইন শৃংখলা রক্ষা বাহিনী গত মাসের শেষের দিকে মিয়ানমারে পাচারের সময় ৭৬৩৬ লিটার অকটেন জ্বালানি, ১৩৬ লিটার ডিজেল এবং ৩৭৫২ লিটার সয়াবিন তেল, সাথে পেঁয়াজ, আদা, রসুন ও চাল জব্দ করেছে। পাচার কাজে জড়িত সন্দেহে ২৮ জন চোরাকারবারীকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ক্রমবর্ধমান চাহিদার জন্য রাখাইন রাজ্য এবং চিন রাজ্যের পালেতোয়ায় মিয়ানমারের জান্তার সাথে তিন জোটের সশস্ত্র বিদ্রোহীদের ক্রমবর্ধমান সংঘাতকে দায়ী করেছে।
সমুদ্র উপকূল, নাফনদী ও সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে মিয়ানমারে জ্বালানি তেল ও ভোজ্যতেলসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য পাচার সংক্রান্ত পরিস্থিতি সামলাতে কক্সবাজার জেলা প্রশাসন গত ১৭ জানুয়ারি বিশেষ সভা করেছে। সভায় জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শাহীন ইমরান তেল পাম্প মালিক ও ব্যবসায়ীদের তার প্রশাসনের কাছে সাপ্তাহিক জ্বালানি ও রান্নার তেলের লেনদেন বিবরণী জমা দিতে বলেছেন।
জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় জ্বালানি ও ভোজ্যতেল বিক্রিকারী প্রতিষ্ঠানকে সাপ্তাহিক তালিকা তৈরি করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর জমা দিতে বলা হয়েছে। তাছাড়া আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নজরদারি বৃদ্ধিসহ নানা সিদ্ধান্ত হয়েছে।
মিয়ানমারের অনান্য প্রদেশ ও অঞ্চলের পাশাপাশি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী প্রায় পুরো রাখাইন প্রদেশে সম্মুখ যুদ্ধ চলে আসছে বেশ কিছুদিন ধরে। রাখাইনের টাউনশীপের মধ্যে প্রাদেশিক রাজধানী সিট্রুয়ে ও মংডু জেলা শহর ছাড়া আরাকানের প্রাচীন রাজধানী মারুক ইউ বা পাথরকিল্লা, মিনপ্যা, কিয়াউকতু, রাটিডং, বুচিডংসহ প্রায় টাউনশীপের যুদ্ধ চলমান। এ অবস্থায় সেখানকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ইন্টারনেট ও তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার নিয়ন্ত্রিত।
রাখাইন রাজ্যের অধিকাংশ এলাকার সঙ্গে দেশটির রাজধানী নেপিডো ও প্রাদেশিক রাজধানী সিট্রুয়ের সড়ক ও নৌ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এসব কারণে পণ্যসামগ্রীর সংকট দেখা দিয়েছে। রাখাইনের সিট্রুয়ে, মংডু, বুচিদং, রাশিদং, কিয়াকতউ, মারোক ইউ, রামরে, পকতুউ, কিয়াকপিউ, অ্যান, মিনপ্যা, থান্ডু এলাকায় নিত্যপণ্যের দাম এখন আকাশছোঁয়া। এ সুযোগে কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তের পুরনো সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটগুলো এসব পণ্যাদি মিয়ানমারে পাচারে তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছে, বিনিময়ে ইয়াবা, গবাদিপশু, আইসসহ হরেক রকমের মাদক পাচার করে আনার সংবাদ পাওয়া যায়।
সূত্রে জানা যায়, মিয়ানমারের সিট্রুয়ে শহরে ৫০ কেজির মাঝারী মানের প্রতি বস্তা চাল বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ হাজার টাকা, প্রতি লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৯০০ টাকা, প্রতি লিটার অকটেনের দাম ৮৫০ টাকা, প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ৭৫০ টাকা, কাঁচা মরিচ প্রতি কেজি ৩০০ টাকা, শুকনো মরিচ প্রতি কেজি ১০০০ টাকা, রসুন ৮০০ টাকা, আদা ৮০০ টাকা, পেঁয়াজ ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে সংবাদ পাওয়া গেছে।
সিট্রুয়ে শহরে অনেকটা এসব পণ্যের সরবরাহ থাকলেও বিধি নিষেধের কারণে অনান্য শহর ও জনপথে সরবরাহ সংকট রয়েছে। এতে সেসব শহর জনপথে হয় সামরিক বাহিনীকে অতিরিক্ত ঘুষ দিয়ে অথবা অধিক মূল্যে পাচারকারীদের কাছ থেকে কিনতে হচ্ছে বলে জানা যায়। এজন্য বাংলাদেশী মাদক ও চোরাকারবারীরা অধিক দামে জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য ও ভোজ্যতেল কিনে মিয়ানমারে পাচারে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
কক্সবাজারের অন্তত ২৫টি পয়েন্ট ব্যবহার করে নৌকা ও ট্রলারে পাচার হচ্ছে এসব তেল ও পণ্য। কক্সবাজার শহরের নাজিরারটেক, নুনিয়ারছড়া, মাঝের ঘাট, খুরুশকুল, চৌফলদন্ডী, কলাতলী, দরিয়ানগর, হিমছড়ি, উখিয়ার ইনানী, সোনাপাড়া, পালংখালী, রাহমতেরবিল, ছেপটখালী, টেকনাফের শাপলাপুর, লম্বরী, মহেশখালীয়াপাড়া, সাবরাং, শাহপরীরদ্বীপ, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলার সমুদ্র উপকূল ব্যবহার করে তা পাচার করে যাচ্ছে সিন্ডিকেট সদস্যরা।
যাদের একটি তালিকাও ইতিমধ্যে তৈরি করেছে প্রশাসন। তালিকায় জ্বালানি ও ভোজ্য তেলের ডিলার প্রতিষ্ঠানের মালিক, জনপ্রতিনিধি ও জেলেদের নাম এসেছে। এসব পাচার কাজে জড়িতরা অনেকটা চিহ্নিত, তারা পুরনো পাচারকারী। মাদকের বিনিময়ে এসব পাচার করে যাচ্ছে। বাংলাদেশী প্রতি টাকার বিপরীতে বর্তমানে ৩৫-৩৭ কিয়াট হিসেবে পণ্য লেনদেনের খবর পাওয়া গেছে। বাংলাদেশী স্থানীয় পাচারকারীদের সঙ্গে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর মধ্যস্থতায় সীমান্তে নিয়োজিত মিয়ানমারের সেনা ও বর্ডার গার্ড সদস্যরা এ অবৈধ পাচার কাজে লিপ্ত বলে জানা যায়।
মিয়ানমারের বিরাজমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) প্রধান গত বৃহস্পতিবার রাখাইন রাজ্যের সাথে বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। যেখানে রাখাইনের আটকাবস্থা শক্তিশালী বিদ্রোহী গ্রুপ আরাকান আর্মি (এএ) একটি শহর এবং মিয়ানমারের কয়েকটি জান্তা ফাঁড়ি দখল করেছে। বিজিবি সদর দফতর জানায়, মেজর জেনারেল একেএম নাজমুল হাসান বান্দরবান, কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী, টেকনাফ এবং সেন্টমার্টিন দ্বীপ সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন এবং চোরাচালান রোধে বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে নির্দেশ দেন।
উখিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী বলেন, মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের লোকজনের মতে তারা আর কোন উদ্বাস্তু নতুন করে আগমন এবং রাখাইনে অবশিষ্ট থাকা রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর প্রভাব সম্পর্কে আশঙ্কা করছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে আর কোনো রোহিঙ্গা বা সেখানকার ক্ষতিগ্রস্ত অনান্য সম্প্রদায়ের উদ্বাস্তুকে সীমান্ত অতিক্রম করতে দেওয়া উচিত নয়। তিনি বলেন, সংঘাতে জড়িত বিদ্রোহীদের সেখানকার রোহিঙ্গারা যাতে সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে।
ফোরটিফাই রাইটসের পরিচালক জন কুইনলি বলেছেন, নভেম্বর থেকে সংঘাতের কারণে রাখাইন রাজ্য জুড়ে মানবিক সহায়তার ওপর জান্তা বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। রোহিঙ্গা ও কামান মুসলিমরা একধরণের আটকাবস্থায় রয়েছে। সামরিক জান্তাকে অবশ্যই তাদের সহিংসতা ও এ সংক্রান্ত অপপ্রচার বন্ধ করতে হবে এবং পদত্যাগ করতে হবে। বাংলাদেশ পশ্চিম মিয়ানমারের উন্নয়ন এবং ক্রমবর্ধমান খাদ্য ঘাটতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে সূত্র জানায়।
-পার্বত্য সময়
দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে বার্মা
বাংলাদেশ থেকে পাচার হচ্ছে জরুরি পণ্য
মিয়ানমারের অন্যতম প্রতিবেশী বাংলাদেশের উদারতার সুযোগে বরাবরের মতো বৈদেশিক মুদ্রায় আমদানিকৃত জ্বালানী ও ভোজ্য তেলসহ জরুরি ভোগ্যপণ্য পাচার রোধ করা কঠিন হয়ে উঠছে।
সি
স্টাফ রিপোর্টার
২৩ জানুয়ারি, ২০২৪ ৯:৪৯ পূর্বাহ্ন৪ মিনিট পড়া

ছবি : সংগৃহীত
শেয়ার করুন:
