ভারতে লোকসভা ভোটের নির্ঘন্ট প্রকাশ হয়েছে শনিবার ( ১৬ মার্চ)। তার ঠিক আগে গত ১১ মার্চ কেন্দ্র সরকার ৪ বছর আগে বিল পাশ হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) দেশজুড়ে কার্যকর করতে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন। কেন্দ্র ক্ষমতায় থাকা বিজেপির বিরোধীরা যদিও সাথে সাথে প্রতিবাদ জানিয়ে দাবি করেছেন, ভোটের আগে এই সিএএ কার্যকর করে ধর্মীয় বিবেদ সৃষ্টির মাধ্যমে ভোটব্যাংক বড় করতে চাইছে মোদী-শাহ। বামশাসিত কেরল এই আইনের বৈধতা নিয়ে মামলাও করেছে। এই আইন কার্যকরের বিষয়টিকে ভোটের আগে মোদী সরকারের ‘ছলনা’ এবং ‘প্রতারণা’ বলে কটাক্ষ করেছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন ভারতের বন্ধু আমেরিকাও। আমেরিকার পররাষ্ট্র দফতরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার বৃহস্পতিবার (১৪ মার্চ) বলেছেন, ‘‘গত ১১ মার্চ ভারত সরকার সিএএ নিয়ে যে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে, আমরা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই আইন কী ভাবে প্রণয়ন করা হচ্ছে, আমরা তার দিকে নজর রেখেছি।’’
২০১৯ সালে নির্বাচনী ইস্তেহারে সিএএ কার্যকরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বিজেপি। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ২০১৯ সালে বিল পাস হয়। ওই বছরেই ১২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর আইনে পরিণত হয় এই সিএএ বিল। যা নিয়ে তোলপাড় পড়ে যায় ভারত জুড়ে। রাজধানী দিল্লিসহ অন্যান্য শহরে সিএএ বিরোধিতায় পথে নামে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলি। শতাধিক সংঘাতের ঘটনায় সরকারি বাহিনীর হাতে কমপক্ষে ৫০ জন আন্দোলনকারী প্রাণ হারায়। ২০২৪ সালে এসে লোকসভার ভোটের প্রাক্কালে গত সোমবার (১১ মার্চ) ‘আচমকা’ সিএএ আইন চালু করার বিজ্ঞপ্তি জারি করে কেন্দ্রের বিজেপি সরকার।
এই আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা অর্থাৎ হিন্দু, বৌদ্ধ,জৈন,শিখ, পার্সি, খ্রিস্টানরা যদি ধর্মীয় উৎপীড়নের কারণে ভারতে আশ্রয় নিতে চান, সে ক্ষেত্রে তাদের নাগরিকত্ব দেবে ভারত। ২০১৪ সালের আগে ৩১ ডিসেম্বরের আগে আশ্রয় চেয়েছিলেন এবং ভারতে পাঁচ বছর বাস করলেই তারা এদেশে নাগরিকত্বের আবেদনের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ২০১৯ সালে বিল পাস হয়। ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল, কোনো ভারতীয় বংশোদ্ভূত বা ভারতীয় উপমহাদেশে জন্মানো নাগরিক নির্দিষ্ট মেয়াদের বেশি সময় এদেশে থাকলে তাকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। সেই আইনে আলাদা করে মুসলিম, অ-মুসলিমদের উল্লেখ ছিল না। এছাড়াও পুরনো আইনে বলা হয়েছিল নাগরিকত্ব পেতে টানা এক বছর ভারতে থাকতে হবে। এছাড়া বিগত ১৪ বছরের মধ্যে ১১ বছর ভারতে থাকা বাধ্যতামূলক। নতুন আইনে ১৪ বছর কমিয়ে ১১ বছর করা হয়েছে।
সিএএ কার্যকর করা নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্য়ে টালবাহানা চলে। উত্তর-পূর্ব ভারত মূলত আসাম থেকেই মূলত আপত্তি উঠেছিল সিএএ নিয়ে। অনেকেরই আশঙ্কা সিএএ কার্যকর হলে শরনার্থীদের ব্যাপক ভিড় বৃদ্ধি পাবে উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলিতে। তার ফলে প্রকট হতে পারে ভাষাগত ও সংস্কৃতিগত সমস্যা। অনেকের আশঙ্কা, ভারতের নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য প্রতিবেশী বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা ব্যাপক হারে ভারতে চলে আসতে পারে। তাছাড়া আসামে থাকা বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদেরও (বাংলাভাষী) নাগরিকত্ব পাওয়ার পথও চওড়া হয়ে যাবে।
এই আইনে মুসলিমদের বাদ দেওয়া নিয়েও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। পাশাপাশি দক্ষিণ ভারতে সিএএ বিরোধিতার মূল কারণ তামিলদের উদ্বাস্তুদের বাদ দেওয়া হল কেন?

এই আইনে হিন্দু, শিখ, জৈন, বৌদ্ধ, পার্সি এবং খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের শরণার্থীদের নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ওই ছয় সম্প্রদায় ছাড়া পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান বা অন্য কোনও দেশ থেকে আসা অন্য কোনও সম্প্রদায়ের শরণার্থীকে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টি বলা হয়নি আইনে। সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল সিএএ-এর ৬ ধারা নিয়ে। এই আইনে বলা হয়েছে ১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারি পর ও ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে যারা আসামে এসেছেন ও থেকে গিয়েছেন তাদের সকলেই নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তা নিয়েই আপত্তি তোলেন আসামের বাসিন্দারা।
বিরোধীদের দাবি, সিএএ ভারতীয় সংবিধানের মৌলিক নীতির বিরোধী। এই আইনের মাধ্যমে 'বৈষম্য' সৃষ্টি করা হয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে। প্রশ্ন ওঠে নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমারের মতো দেশগুলি আগত শরণার্থীদের কথা কেন উল্লেখ করা হল না আইনে।
ভারত বারবার ঘোষণা করেছে, সিএএ তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তাদের আইনে স্পষ্টভাবে ৩টি আলাদা দেশের নাম (বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান) উল্লেখ করা হয়েছে এবং এসকল দেশে 'ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার' বলার পর কিভাবে অভ্যন্তরীণ বিষয় থাকতে পারে? ভারত অবশ্যই একটি পরিসংখ্যান করবে যে, কোন দেশ থেকে কত শরণার্থীর আশ্রয় দিয়ে নাগরিকত্ব দিয়েছে তারা। যে দেশ থেকে সংখ্যা বেশি হবে, সেই দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যবস্থা নাজুক বলেই বিবেচিত হবে। সুতরাং এই আইনের সাথে উল্লেখ্য এই তিন দেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ।
বাকী দুই দেশের অবস্থা যাই হোক বাংলাদেশে সিএএ এর সম্ভাব্য প্রভাব বেশি পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ আফগানিস্তানের সঙ্গে ভারতের কোনো সীমান্ত নেই। অন্যদিকে ভারত- পাকিস্তান সীমান্তে সার্বক্ষণিক উত্তেজনা বিরাজমান। এ পরিস্থিতিতে সিএএ আইনের কারণে নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা হারানো ভারতীয় মুসলমানদের সবচেয়ে বেশি অনুপ্রবেশ ঘটার আশঙ্কা বাংলাদেশের সীমান্ত দিয়ে। বিবিসির একটি রিপোর্টে ইতিমধ্যে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের কিছু ঘটনা তুলেও ধরা হয়েছে।
আইনের বিল পাশের মাসখানেক পরে ভারতে গিয়ে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন বলেছিলেন, ভারতে কোনো অস্থিরতা তৈরি হলে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। তবে এটা যে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়, সে কথাও জানিয়েছিলেন সঙ্গে।
দীর্ঘদিন চুপ থেকে ২০২০ সালে সংযুক্ত আরব আমিররাত সফরে গিয়ে সংবাদ মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘‘আমরা বুঝতে পারিনি ভারত সরকার কেন এটা (সিএএ) করল। এর কোনও প্রয়োজনই ছিল না।’’ তবে এটা যে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ সেটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা হাসিনা।
বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদও বিষয়টিকে ভারতের 'অভ্যন্তরীণ বিষয়' বলেই থেমে গেছেন।
নাগরিকত্ব বিল পাশ হওয়ার আগে এনআরসি নিয়ে মোদীকে তার উদ্বেগের কথা জানিয়েছিলেন শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের সাধারণ সম্মেলনের ফাঁকে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের কথা হয়েছিল। তখন হাসিনা মোদীকে বলেছিলেন, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে এনআরসি তাদের কাছে ‘গভীর উদ্বেগের’। তবে মোদী তখনও আশ্বস্ত করেছিলেন যে দু’দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক রয়েছে। তাই উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই।
দক্ষিণ এশিয়ার এই গোটা অঞ্চলে অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে ভারত উদ্বাস্তু সমস্যা নিয়ে কিছুটা সহনশীল। তিব্বত থেকে আসা শরণার্থী, শ্রীলঙ্কার তামিল, বাংলাদেশ এবং মিয়ানমারের চাকমা, রোহিঙ্গা শরণার্থী, আফগানিস্তান থেকে আসা অমুসলিম তথা হিন্দু, জৈন, শিখ, খ্রিস্টান বিভিন্ন সময়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। দশকের পর দশক ভারত তাদের আশ্রয়ও দিয়েছে। এবং ভারত বলেছে, তারা অবশ্যই নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের আশ্রয় দেওয়ার নীতি থেকে সরে আসবে না।
কিন্তু সেটা করতে গিয়ে যদি ধর্মনিরপেক্ষ নীতির বদলে ক্ষমতাসীনদের পছন্দের কোনো বিশেষ ধর্মকে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হয়, তা হলে বিষয়টি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের জটিলতা তৈরি করতে পারে ও সংবিধানের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্রের হানি ঘটাবে। বিশেষত, ভারতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও মন্দির-মসজিদ নিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের পটভূমিতে এই আইন মুসলিম-বিরোধী মনোভাবের প্রতিফলন বলে সমালোচিত হচ্ছে ।
-পার্বত্য সময়

