রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমার সরকারের মিথ্যা বিশ্বাস করেছিলাম। পরে নিজের চোখে সত্য দেখেছেন বলে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ইয়াঙ্গুনের এক নাগরিক। ২০১৭ সালে একটি আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থায় কাজ করার সময় রাখাইন রাজ্যে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে নিরাপত্তা চৌকিতে মুসলিম ‘চরমপন্থীদের’ হামলার পর মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক বিবৃতি দেওয়া হতে থাকে। এসব বিবৃতি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও প্রচার করা হতো। নিহত নিরাপত্তা সদস্যরা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রাণ দিয়েছেন এবং সরকার দেশের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে এমন সব বিবৃতি প্রচার করা হতো বলে জানান তিনি।
ইয়াঙ্গুনের এই নাগরিক বলেন, শুরুতে তিনি মিয়ানমার সরকারের সেই বক্তব্য বিশ্বাস করেছিলেন। কারণ, এটি ছিল অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) সরকারের বক্তব্য। সে সময় সেই সরকারকে তিনি ভোট দিয়েছিলেন এবং গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের আশার প্রতীক হিসেবে দেখেছিলেন।
কিন্তু কয়েক দিন পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ সহিংসতার ছবি ও প্রতিবেদন দেখতে পান তিনি। সেখানে দেখা যায়, নারী-পুরুষ ও শিশুরা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে ছুটছে। কেউ সন্তানকে কোলে নিয়ে, কেউ বৃদ্ধ বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে দিনের পর দিন হেঁটে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে মিয়ানমারের সরকারি সমর্থকেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও জাতীয় সংবাদপত্রে ভিন্ন একটি বয়ান প্রচার করছিলেন। তাদের কেউ কেউ দাবি করছিলেন, রোহিঙ্গারা আন্তর্জাতিক সহানুভূতি পাওয়ার জন্য নিজেরাই নিজেদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে তুলে ধরে বলা হচ্ছিল, তারা মিয়ানমারের ভূমি দখল করতে এসেছে।
নিজের সেই অবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি তাদের বিশ্বাস করেছিলাম, কোনো প্রশ্নও করিনি।’
২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে একটি মানবিক মিশনে রাখাইন রাজ্যে যাওয়ার দায়িত্ব পান তিনি। এর আগে কয়েকবার রাখাইন সফর করলেও এবারকার অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
সিত্তে থেকে উত্তরের দিকে যাওয়ার সময় প্রথমে সবুজ ধানখেত ও প্রাণবন্ত পরিবেশ চোখে পড়লেও যতই উত্তরে এগোচ্ছিলেন, দৃশ্যপট ততই বদলে যেতে থাকে। সবুজ রং ধীরে ধীরে ধূসর হয়ে যায়। একপর্যায়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকায় শুধু ছাই।
তিনি জানান, মাঠজুড়ে কালো ছাই ছড়িয়ে ছিল। গাছের প্রায় মাথা পর্যন্ত পোড়া চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল। একের পর এক পুরো গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। যেসব রোহিঙ্গা গ্রাম তখনো টিকে ছিল, সেখানে গিয়ে তিনি সহিংসতার ভয়াবহতার নানা গল্প শোনেন।
তবে নিজের চোখে ধ্বংসযজ্ঞ দেখার অভিজ্ঞতা তাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয়।
তিনি জানান, এসবের সত্যতা নিয়ে তখন তার মনে প্রশ্ন জেগেছিল।
তিনি বলেন, এগুলো ছিল মানুষের বাড়িঘর, স্মৃতি ও জীবন। অথচ সবকিছু এক মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
পরে মংডু টাউনশিপের আলেথান কিয়াও সৈকতে গিয়ে তিনি শত শত, সম্ভবত হাজারো রোহিঙ্গা মানুষকে দেখতে পান। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে তারা সৈকতে আটকা ছিলেন। সামান্য চাটাই ও সঙ্গে করে নিয়ে আসা কাপড় দিয়ে তৈরি অস্থায়ী তাঁবুতে তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশে প্রবেশ করা।
সেখানে এক রোহিঙ্গা নারীর কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন তিনি। ভাষাগত কারণে কথা বলার সুযোগও পাননি। ওই নারী নিজের শিশুকে কোলে নিয়ে তাকে অস্থায়ী তাঁবুর ভেতরে আশ্রয়ের জন্য আমন্ত্রণ জানান।
তার ভাষ্য, ওই নারী তখন সবকিছু হারিয়েছেন, ভয়াবহ সহিংসতা থেকে বেঁচে এসেছেন। তারপরও একজন অপরিচিত মানুষকে নিজের সামান্য আশ্রয় ভাগ করে নেওয়ার মতো মানবিকতা তার মধ্যে ছিল।
ফিরে আসার পথে তিনি বারবার ভাবছিলেন-মানুষগুলো যদি নিজেদের ঘরবাড়ি পুড়িয়ে থাকে, তাহলে কেন তারা জীবন বিপন্ন করে বিপজ্জনক সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পালাচ্ছে? কেনই বা মা-বাবা ও শিশুরা শুধু রোহিঙ্গা পরিচয়ের কারণে প্রাণ হারাবে?
তখনই তিনি উপলব্ধি করেন, মিয়ানমার সরকার সমন্বিতভাবে ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিকর বয়ান ছড়িয়ে আসছিল।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘এটি যদি গণহত্যা না হয়, তাহলে গণহত্যা কী? এটি যদি মানবতার সবচেয়ে ভয়াবহ উদাহরণগুলোর একটি না হয়, তাহলে আর কী?’
তার মতে, রাখাইনে দেখা ধ্বংসযজ্ঞ ছিল ইতিহাসের বইয়ে দেখা দৃশ্যের মতো। কিন্তু সেটি ইতিহাস ছিল না, বাস্তবেই তার চোখের সামনে ঘটছিল।
তিনি বলেন, মিয়ানমারের অনেক মানুষ ছোটবেলা থেকে একটি নির্দিষ্ট বয়ান শুনে বড় হয়েছেন। একই কথা বারবার বলা হয়েছে, একপর্যায়ে সেটিই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তার দাবি, এখনো মিয়ানমারে অনেকে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করেন এবং তাদের ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত করেন। এমনকি যারা বর্তমানে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে নিজেদের বিপ্লবী হিসেবে পরিচয় দেন, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের বিদ্বেষ ও অস্বীকৃতির বয়ান বহন করছেন।
কাউকে আক্রমণ করা তার উদ্দেশ্য নয় জানিয়ে উল্লেখ করে বলেন, তিনি নিজেও একসময় একই ভুল বিশ্বাস করেছিলেন, এ কথা স্বীকার করাই তার বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য।
তিনি বলেন, সামরিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই করাই যথেষ্ট নয়। নিপীড়নকে সম্ভব করে তোলে যে চিন্তাধারা, তার বিরুদ্ধেও লড়তে হবে। মানুষকে ধর্ম, জাতিসত্তা, জাতীয়তা বা রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষ হিসেবে দেখতে হবে।
একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করা, তাদের বাস্তুচ্যুত করা কিংবা পরিচয়ের কারণে হত্যা মেনে নেওয়া হলে একই ঘটনা অন্য জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও ঘটানো সহজ হয়ে যায় বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চলে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিও তিনি রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি থেকে মুখ না ফেরানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, রোহিঙ্গা গণহত্যা ২০১৭ সালে হঠাৎ শুরু হয়নি এবং সেখানেই শেষও হয়নি। এর পেছনে ছিল কয়েক দশকের বৈষম্য ও নিপীড়নের ইতিহাস।
তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা এখনো বাংলাদেশের কক্সবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ঘনবসতিপূর্ণ আশ্রয়শিবিরে বসবাস করছেন। তাদের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। অন্যদিকে রাখাইন রাজ্যেও কয়েক লাখ রোহিঙ্গা প্রতিদিন সহিংসতা, ভয় ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করছেন।
শেষে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তিনি আহ্বান জানান, দয়া করে চোখ ফিরিয়ে নেবেন না। চোখ ও কান বন্ধ করবেন না। কারণ, আজ যে নৃশংসতার দিকে বিশ্ব তাকাচ্ছে না, ভবিষ্যতে সেটিই হয়তো আরেকটি ইতিহাস হয়ে দাঁড়াবে। যে ইতিহাসে বলা হবে, একটি ভয়াবহ অপরাধ ঘটার সময় বিশ্ব তা থামাতে ব্যর্থ হয়েছিল।
সূত্র: ফর্টিফাই রাইটসের প্রতিবেদন থেকে বাংলায় অনুবাদ করা


