মিয়ানমারের রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চল রাখাইনে সক্রিয় শক্তিশালী বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির প্রতিরোধের মুখে ক্রমেই পিছু হটছে জান্তার সেনাবাহিনী। গত ১ বছরে জান্তা সরকারের সেনাদের হটিয়ে রাজ্যে ১০টি জনপদ দখলে নিয়েছে তারা। রাখাইনে অধিকাংশ বাসিন্দা খাদ্যের জন্য বর্তমানে সম্পূর্ণ সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। রাজ্যের আট লাখ ৭৩ হাজার জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ কম লোকের কাছে এই সহায়তা পৌঁছাচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। সব এলাকায় খাবার পৌঁছাতে না পারলে অনাহারে অনেকের মৃত্যু হতে পারে বলেও শঙ্কা সংস্থাটির।
আরাকান আর্মির দখলকৃত অঞ্চলগুলোতে ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের অনাহারে রাখছে জান্তা সরকার। চেকপোস্টে নজরদারি বৃদ্ধি, রাস্তাঘাট ও নৌপথ অবরোধ এবং মানবাধিকার কর্মীদের কাজের অনুমতি না দিয়ে খাবারের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করছে সেনাবাহিনী। এ ছাড়া ইন্টারনেট সেবা বন্ধ থাকায় সহায়তা কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটছে বলে অভিযোগ ত্রাণকর্মীদের। নানাভাবে বাধা দিয়ে সেনাবাহিনী খাদ্যকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের। তা ছাড়া একে যুদ্ধাপরাধের সাথে তুলনা করেছেন তারা। অনাহারের জন্য বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ এনেছেন মিং অং লাইং প্রশাসন। নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং সংঘাতের প্রভাবে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়াও দেশটির খাদ্যসঙ্কটের অন্যতম কারণ। এ ছাড়াও মিয়ানমার সরকার সব নাগরিকের সমতার প্রতি প্রতিশ্রুতবদ্ধ বলে দাবি তাদের।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু এলাকায় সরকারি বাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সাথে চলা যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে। ওপার থেকে বোমা ও মর্টারশেলের শব্দে কাঁপছে টেকনাফের বাড়িঘর। আতঙ্কে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে এ হামলা শুরু হয় শনিবার ভোরবেলা পর্যন্ত থেমে থেমে বোমা ও মর্টার শেলের হামলার শব্দে কাঁপছে টেকনাফ সীমান্ত এলাকা। টেকনাফ পৌরসভা, হ্নীলা, জাদিমুড়া, দমদমিয়া, নাইট্যংপাড়া, জালিয়াপাড়া, নাজিরপাড়া, সাবরাং, শাহপরীর দ্বীপ, খারাংখালী নাফ নদীর মোহনা ও নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্ত থেকে শোনা যাচ্ছে বিস্ফোরণের বড় বড় শব্দ।
সীমান্তের লোকজন জানান, দীর্ঘ দিন বন্ধের পরে এই প্রথম কোনো বড় ধরনের মর্টারশেল বিস্ফোরণের বিকট শব্দে কাঁপছে টেকনাফ। রোহিঙ্গারা জানিয়েছে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে মংডু শহরে আরাকান আর্মি ও সশস্ত্রবাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ চলমান আছে। যুদ্ধে মংডু শহরে অনেক রোহিঙ্গা হতাহত হচ্ছেন। এমনকি জীবন রক্ষার্থে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর ছেড়ে যেতে মাইকিং করা হচ্ছে। বর্তমানে মংডুর অধিকাংশ গ্রামে লোকজন নেই বললেই চলে।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা রুহুল আমিন বলেন, মংডু শহরে সেনাবাহিনীর অধিকাংশ ঘাঁটি দখল করে নিয়েছে আরাকান আর্মি। শহরের হাইন্দাপাড়া সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে হামলা চালাচ্ছে আরাকান আর্মি। আমাদের গ্রামে আর কোনো লোক নেই। বড় বড় অস্ত্র দিয়ে হামলা চালাচ্ছে, আমাদের জীবনযাপন করতে কষ্ট হচ্ছে। তাই জীবন বাঁচাতে সাগরপথে বাংলাদেশ চলে এসেছি।
হ্নীলা ওয়াব্রাং এলাকার সীমান্ত বাসিন্দা কামাল বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে ১০-১৫ মিনিট পরপর মর্টারশেল বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে; যে কারণে আমরা আতঙ্কিত হয়ে রাত জেগেছিলাম।
সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুর হোসেনের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম নয়াদিগন্ত জানায়, রাত থেকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে মর্টারশেল বিস্ফোরণের ভারী আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। তবে এলাকার সীমান্তের কাছাকাছি বসবাসরত লোকজনকে আতঙ্কিত না হওয়ার জন্য সতর্ক করা হয়েছে।
টেকনাফ-২ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: মহিউদ্দিন আহমেদ নয়াদিগন্তকে বলেন, মিয়ানমারে চলমান সঙ্ঘাতের কারণে নাফ নদ সীমান্ত দিয়ে যাতে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করতে না পারে সে জন্য সতর্ক অবস্থানে রয়েছি আমরা। সীমান্তে যেকোনো ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে আমরা প্রস্তুত।
-পার্বত্য সময়

