জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (ইউএনএইচসিআর) ফিলিপ্পো গ্রান্ডি বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে— তাই এর স্থায়ী সমাধানও কেবল সেই দেশের ভেতরেই সম্ভব। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ ছাড়া রোহিঙ্গাদের দুর্দশা থামবে না বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত ‘মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে বক্তব্য দেন গ্রান্ডি।

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, আট বছর আগে মিয়ানমারের সেনাদের সহিংসতার কারণে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়। পাশাপাশি, বহু রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করছে।

গ্রান্ডি বলেন, বর্তমানে রাখাইনের কিছু অংশ আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকলেও রোহিঙ্গাদের জীবনমানের তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। তাদের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, গ্রেপ্তার-আটকের ভীতি, জোরপূর্বক শ্রম, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় সীমাবদ্ধতা— সবকিছুই আগের মতো চলছে। প্রতিদিনই তারা বর্ণবাদী আচরণ ও আতঙ্কের শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। শুধু তাই নয়, ২০২৪ সালে নতুন সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে আরও দেড় লাখ রোহিঙ্গাকে গ্রহণ করেছে।
গ্রান্ডি বলেন, “অসংখ্য চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বের সামনে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।”

ইউএনএইচসিআর প্রধান বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ১.২৫ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা তহবিলের প্রশংসা করলেও বলেন, রোহিঙ্গা শিবিরে মানবিক সহায়তায় এখনো বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, পর্যাপ্ত অর্থ না থাকলে জরুরি সহায়তা কমিয়ে আনতে হবে। এতে শিশুদের অপুষ্টি বাড়তে পারে এবং রোহিঙ্গাদের ঝুঁকিপূর্ণ নৌযাত্রায় প্রাণহানির আশঙ্কা আরও বাড়বে।

গ্রান্ডি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন, শিক্ষা ও শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ সৃষ্টির আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “কেবল মানবিক সহায়তায় এই সংকট সমাধান হবে না। আমরা উদাসীন থাকতে পারি না। একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস হতে দিয়ে সমাধান আশা করা যায় না।”

তার মতে, মিয়ানমার যদি সাহসী ও স্থায়ী পদক্ষেপ নেয়, তবেই রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব।

শেষে তিনি প্রভাবশালী দেশগুলোকে মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির সঙ্গে সক্রিয় সম্পর্ক বৃদ্ধির আহ্বান জানান। তার ভাষায়, এর মাধ্যমে মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়সঙ্গত সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।