ভারতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, বাংলাভাষী মুসলিম ও দলিত সম্প্রদায়ের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক নিপীড়নের অভিযোগে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে জাতিসংঘের বর্ণবৈষম্য বিলোপ কমিটি (ইউএনসিইআরডি)। এসব অভিযোগের বিষয়ে অবিলম্বে, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং জড়িত ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে কমিটি।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের (ওএইচসিএইচআর) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা বলা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ভারতে বর্ণভিত্তিক সহিংসতা, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই অন্যায় ও দীর্ঘমেয়াদি আটক, নির্যাতন, অপব্যবহার এবং যৌন সহিংসতার মতো ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
কমিটির দাবি, ২০১৭ সালে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া নির্দেশনা এবং ২০২৫ সালের এপ্রিলে কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলার পর বিশেষ করে রোহিঙ্গা, বাংলাভাষী মুসলিম, অভিবাসী ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের লক্ষ্য করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, বর্ণ বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে পুলিশি তল্লাশি ও পরিচয় যাচাইয়ের নামে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই মানুষকে অন্যায়ভাবে গ্রেপ্তার ও আটকের অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কোথাও আটক ব্যক্তিদের নির্যাতন ও অপব্যবহারের শিকার হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তাদের ঝুঁকিপূর্ণ দেশে ফেরত না পাঠানোর আন্তর্জাতিক নীতি ‘নন-রিফৌলমেন্ট’ লঙ্ঘন করে মানুষকে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর অভিযোগেও উদ্বেগ জানিয়েছে ইউএনসিইআরডি।
কমিটি ভারতকে রোহিঙ্গা, বাংলাভাষী মুসলিম, অভিবাসী ও রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ঘৃণামূলক অপরাধ বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে এসব জনগোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা, ঢালাও বহিষ্কার বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজন থাকা ব্যক্তিদের জন্য নন-রিফৌলমেন্ট নীতি মেনে চলার তাগিদ দিয়েছে।
জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ প্রত্যাখ্যান ভারতের
এদিকে ইউএনসিইআরডির পর্যবেক্ষণ প্রত্যাখ্যান করেছে ভারত। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব মন্তব্যকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘অত্যন্ত বিদ্বেষপূর্ণ’ বলে আখ্যা দিয়েছে।
ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, বুধবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে এ অবস্থান জানায়।
বিবৃতিতে বলা হয়, সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ১১ ও ১২ আগস্ট বর্ণবৈষম্য বিলোপবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদের (আইসিইআরডি) আওতায় ভারতের ১১তম পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই পর্যালোচনার পর ইউএনসিইআরডি যেসব পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেছে, তা ভারত লক্ষ্য করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবি করেছে, পর্যালোচনা প্রক্রিয়াজুড়ে তারা দেশের সাংবিধানিক সুরক্ষা, বিস্তৃত আইনি কাঠামো, বহুমাত্রিক ও বহুত্ববাদী সংস্কৃতি এবং অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয় তুলে ধরেছে।
উল্লেখ্য, বর্ণবৈষম্য বিলোপবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে ১৮২টি দেশ স্বাক্ষর করেছে। ১৯৬৯ সালে কার্যকর হওয়া এই সনদের আওতায় সদস্যদেশগুলোর বর্ণবৈষম্য দূর করা, জাতিগত পৃথকীকরণের চর্চা বিলুপ্ত করা এবং আইনের চোখে সবার সমতা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
সনদ বাস্তবায়নে দেশগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করে ১৮ জন স্বাধীন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত ইউএনসিইআরডি।


