ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসি (সিবিপি) এর আয়োজনে খ্যাতনামা গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের ভার্চুয়াল উপস্থিতিতে CBP পলিসি ডায়ালগ সিরিজ  ২০২৪ এর প্রথম অংশ অনুষ্ঠিত হলো।

সিবিপি'র পূর্বঘোষিত সময় অনুযায়ী ২০ মার্চ (বুধবার) রাত ১০ টা থেকে শুরু হয় এ আলোচনা অনুষ্ঠান। দেশ ও দেশের বাইরের প্রায় ৫ শতাধিক নেটাগরিক এখানে অংশগ্রহণ করেন।

CBP পলিসি ডায়ালগ সিরিজ -২০২৪ এর প্রথম অংশের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল 'রোহিঙ্গা সংকটে নতুন মোড়: সমসাময়িক ঘটনা ও পরিণতি'। অনুষ্ঠানে বক্তারা গবেষণা, তথ্য-উপাত্ত, অনুমান ও বাস্তবতার নিরিখে এ সংকট থেকে সম্ভাব্য সমাধান বিষয়ে তাদের নিজস্ব মতামত তুলে ধরেন।

অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম উপস্থাপকের ভূমিকা পালন করেন। তারই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের অধ্যাপক ড. রফিক শাহরিয়ার, বাংলাদেশ সরকারের থিংক ট্যাংক খ্যাত বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউট অফ ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এর গবেষণা পরিচালক এএসএম ইউসুফ এবং বেসরকারি সংবাদমাধ্যম যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ সংবাদদাতা মাহফুজুর রহমান মিশু।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই স্বাগত বক্তব্যে ড. কাজী মারুফুল ইসলাম বাংলাদেশকে বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ উল্লেখ করে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের দেশটির জন্য একটি বড় চাপ বলে সংজ্ঞায়িত করেন। তিনি মনে করেন, জরুরি মানবিক সংকট কাটিয়ে রোহিঙ্গারা দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন। দীর্ঘ সময় এদেশে অবস্থানের ফলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির মধ্যে এক ডেমোগ্রাফিক পরিবর্তন ঘটছে। এদের সম্মানজনক প্রত্যাবসান এখন বড় উদ্বেগের কারণ।

এছাড়া মায়ানমারের অভ্যন্তরে সেনাবাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী কিছু গোষ্ঠীর লড়াইয়ের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এমতাবস্তায় পুরো ইন্দো-প্যাসেফিক অঞ্চলের সামগ্রিক চিত্র পাল্টে গেছে। এ অঞ্চলের পরাশক্তিগুলোর মধ্যেও বিরোধপূর্ণ সহাবস্তান রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রভাব ফেলছে। 

May be an image of 8 people
'রোহিঙ্গা সংকটে নতুন মোড়: সমসাময়িক ঘটনা ও পরিণতি' শীর্ষক বৈঠকে কথা বলছেন অথিতিবৃন্দ  ছবি : পার্বত্য সময় 

অনুষ্ঠানের আলোচক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের অধ্যাপক ড. রফিক শাহরিয়ার বলেন, ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের বড় কারণ ছিল বিশ্ব সম্প্রদায়ের অনুরোধ। তারা সবরকম সহযোগিতা প্রদানপূর্বক দ্রুততম সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবসানে ব্যবস্থা নিবেন বলে প্রধানমন্ত্রীকে বলেছিলেন। কিন্তু তৎপরবর্তী সময়ে রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ ও গাজা হামলার পর বিশ্ব সম্প্রদায় এখান থেকে নজর ফিরিয়ে নেয়।

পিস অ্যান্ড কনফ্লিক্ট বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি মনে করেন, মায়ানমারের ভিতরে চলমান বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনোভাবেই প্রত্যাবাসনের প্রসঙ্গে কথা বলা যাবে না। তার মতে, মিয়ানমারকে আগে স্ট্যাবল (স্থিতিশীল) হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, সামনে তিনটি পরিস্থিতি মিয়ানমারের ঘটতে পারে। এক. দেশটির মিলিটারিকে আঞ্চলিক গোষ্ঠিগুলোর সাথে জিতে ক্ষমতা ধরে রাখা, দুই. মিলিটারি পরাজিত হয়ে নতুন কোনো শক্তির ক্ষমতায় আসতে পারে এবং তিন. মায়ানমারের কিছু অংশে সেনাবাহিনী এবং বাকী অংশে অন্যান্য গ্রুপগুলোর হাতে ক্ষমতা থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে মায়ানমারের ভেতরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলমান অবস্থায় কিছুতেই প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে না।

দেশটিতে চলমান সংঘাতে মায়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের হয়ে যুদ্ধ করার জন্য রোহিঙ্গাদের আহ্বান জানাচ্ছেন বলে দাবি করে ড. রফিক বলেন, এ বিষয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের নাম জড়ানো ঠিক হবে না। এতে পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বিআইআইএসএস এর গবেষণা পরিচালক এএসএম ইউসুফ বলেন, বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত কূটনীতিকভাবে সফল। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বা ফিরে যাওয়াই যে একমাত্র সমাধান এটা বিশ্ববাসীকে বুঝাতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ।

এছাড়াও বাংলাদেশকে কোনোভাবেই প্রতিবেশী দেশের কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না বলে মনে করেন এই গবেষক। একইসাথে তিনি বলেন, বাংলাদেশ তার কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে প্রত্যেক স্টেক হোল্ডারের সাথে যোগাযোগ রেখে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের পথ খুঁজছে।
সাংবাদিক মাহফুজুর রহমান মিশু তার বক্তব্যে প্রশ্ন তুলেন, রাখাইনে যদি আরাকান আর্মি ক্ষমতায় আসে সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্ভব কি না? এ প্রসঙ্গে তিনি তিস্তা পানি বণ্টনের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, ভারত-বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মতি সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের কারণে পানি বন্টন হচ্ছে না। একইভাবে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছা থাকলেও আঞ্চলিক ক্ষমতাসীন দলের কারণে প্রত্যাবসান পরিকল্পনা ভেস্তে যেতে পারে।
মিশু মনে করেন মিয়ানমার সম্পর্কে বাংলাদেশের মানুষের সঠিক ধারনা নেই। প্রতিবেশি দেশ হিসেবে ভারতের সার্বক্ষণিক খবর যেভাবে আমরা রাখি, মিয়ানমার সম্পর্কে তেমনি ভালো ধারনা রাখা জরুরি। মূলধারার গণমাধ্যমে মিয়ানমার নিয়ে আলোচনার তাগিদ দেন তিনি।

তিনি পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর মিয়ানমারের প্রেক্ষিতে অবস্থানের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পরামর্শ দেন, অনেক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিবেশি দেশ ভারত ও চীনকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক আস্থার জায়গা সৃষ্টি করতে হবে বাংলাদেশকে।
 

-পার্বত্য সময়