আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী গণমাধ্যম আল-জাজিরা মিয়ানমারে চলমান সংঘাত নিয়ে এক অনুসন্ধানী খবর প্রকাশ করেছে। 'পশ্চিমা স্বেচ্ছাসেবী যোদ্ধারা মিয়ানমারের জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দিয়েছে' শিরোনামের ওই খবরে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের দুই স্বেচ্ছাসেবীর বরাত দিয়ে দাবি করেছে তারা মিয়ানমারের জান্তার বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান থেকে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। খবরটি বর্তমান বিশ্ব রাজনীতি ও মিয়ানমারের চলমান গৃহযুদ্ধের জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ওই খবরে বলা হয়েছে- 
মায়ানমারের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দেশটির বিদ্রোহীদের পাশাপাশি বিদেশী যোদ্ধারাও অংশ নিচ্ছেন। তারা বর্তমানে সংখ্যায় কম হলেও ধীরে ধীরে বাড়ছে। এই যোদ্ধারা সামরিক প্রশিক্ষণ ও সরাসরি যুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছে। বিদেশী এই যোদ্ধাদের একজন প্রাক্তন ব্রিটিশ সৈনিক এবং একজন আমেরিকান যোদ্ধা।
এই স্বেচ্ছাসেবক বিদেশী যোদ্ধাদের দাবি, তারা মিয়ানমারের বিদ্রোহীদের প্রতিরোধে অনুপ্রাণিত হয়ে সেখানে অংশগ্রহণ করেছেন। তারা বলছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম নৃশংস এবং সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি যারা ৩ বছরেরও আগে ক্ষমতা দখল করেছে এবং শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের হত্যা করেছে।
জেসন ২০০৯ সাল থেকে চার বছর ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে একজন পদাতিক সদস্য ছিলেন। তার দাবি, আফগানিস্তানে সাত মাসের সফরে ছিলেন এবং সেখানে আট সপ্তাহ সামনের লাইনে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ করার পর এপ্রিলের শেষের দিকে পূর্ব মায়ানমার থেকে ফিরে আসেন।
জেসন (ছদ্মনাম) বলেছিলেন, প্রতিরোধ যোদ্ধারা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে মরতেও প্রস্তুত।
তিনি বলেন, আমি আগে যেখানে যুদ্ধ করেছি এটা সেসব জায়গা থেকে আলাদা। সেখানে আপনি মানুষের চোখে ভয় দেখতে পাবেন। কিন্তু মিয়ানমারের এই প্রতিরোধ যোদ্ধারা সাহসী মানুষ।"
মিয়ানমারে ১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১-এর অভ্যুত্থানের পর থেকে নৃশংসতা সীমান্ত থেকে কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। সামরিক বাহিনী, একটি বৃহত্তর রাশিয়ান-নির্মিত যুদ্ধবিমানের বহর নিয়ে, বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে নির্বিচারে বিমান হামলা চালিয়ে গ্রামগুলিকে পুড়িয়ে মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ এবং মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এ ঘটনাকে সম্ভাব্য যুদ্ধাপরাধ হিসাবে বর্ণনা করেছে।
কিন্তু জেনারেলরা বিদ্রোহ দমন করতে পারেনি। এই প্রতিরোধের কারণে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হলেও রাশিয়া এবং চীনের এক বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র দিয়ে সুসজ্জিত এই সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে স্লিংশট (গুলতি)এবং এয়ার রাইফেল ব্যবহার করেই ব্যাপক সফলতা পেয়েছে।
জনসাধারণের অনুদান এবং এবং গত বছরের অপারেশন ১০২৭ এ জব্দকৃত অস্ত্র প্রতিরোধের গতি আরও বাড়িয়েছে। এমনকি বিদেশী সামরিক সহায়তা ছাড়াই সেনাবাহিনীর টিকে থাকার ক্ষমতাকে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো চ্যালেঞ্জ করেছে।
বিদেশী স্বাধীন যোদ্ধারা গোপন প্রচেষ্টায় মায়ানমারের পূর্ব ও পশ্চিমে যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে। তবে তারা নিজ দেশে বিচারের ঝুঁকিতে আছে।
আল জাজিরা পূর্ব মায়ানমারে প্রতিরোধের পাশাপাশি জেসনের লড়াইয়ের ফুটেজ ও ছবি দেখেছে। আল জাজিরার দুজন এজেন্ট তাকে প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধ করতে দেখেছে।
তিনি বলেন, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পরপরই এক ব্রিটিশ প্রবীণ ব্যক্তিকে দেখেছি যে প্রায় দেড় বছর যুদ্ধ করেছিলেন।
জেসন বলেন, "আমি একটি ভাড়াটে নই। আমি যা সঠিক বলে মনে করি, আমি তাই করি।"
ইউক্রেনে অপ্রশিক্ষিত ও অনভিজ্ঞ বিদেশি যোদ্ধাদের তিনি দেখে এসেছেন। তিনি মিয়ানমারের জন্য তা চান না।
তিনি বলেন, এখানে সবসময় উদ্বেগ থাকে যে নির্বোধদের নিয়ে মিয়ানমার পরবর্তী ইউক্রেন হয়ে উঠতে পারে।  তিনি একটি নামহীন প্রতিরোধ বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন।
তিনি এখন যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার ছয় থেকে দশ জন প্রাক্তন সেনাদের একটি দল সংগঠিত করে বিদ্রোহীদের সাহায্য করার জন্য ফিরে আসার পরিকল্পনা করেছেন।
তিনি বলেন, "আমাদের কাছে চারটি ভিন্ন সেনাবাহিনীর জ্ঞান রয়েছে যা আমরা প্রতিরোধ যোদ্ধাদের শেখানোর জন্য ব্যবহার করতে পারি। তাদের সাহায্য করার জন্য আমার অভিজ্ঞতা আমার তাগিদকে আরও দৃঢ় করেছে। তারা শুধু তাদের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র চায়।
তিনি এই বছরের শেষের দিকে মিয়ানমারে পৌঁছানোর আশা করছেন।
তিনি বলেন, “আমরা আমাদের নিজেদের দল নিয়ে তাদের ত্রাণকর্তা হতে চাই না। আমরা তাদের সিস্টেমে কাজ করব।"
তিনি আরও বলেন, "আমরা বিনামূল্যে সব করছি। আগ্রহী মানুষদের শুধু কাজের ছুটি নিতে হবে।"
'সব এক সংগ্রাম'
মিয়ানমারের অপর দিকে, ভারতের সীমান্তবর্তী পাহাড়ী চিন রাজ্যে, পিপলস ডিফেন্স ফোর্স জোল্যান্ড (পিডিএফ জোল্যান্ড) প্রতিরোধ গোষ্ঠী ১১ মে সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ছবি পোস্ট করেছে যেখানে দুই বিদেশী স্বেচ্ছাসেবককে দেখানো হয়েছে। এদের একজন দক্ষিণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আজাদ (ছদ্মনাম) এবং একজন ব্রিটিশ স্বেচ্ছাসেবক। এই ব্রিটিশ স্বেচ্ছাসেবক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আজাদ বলেছিলেন যে তিনি স্নাইপার এবং পদাতিক বিষয় শেখানোর পাশাপাশি রিকনেসান্স এবং অন্যান্য সামরিক দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি চিন রাজ্য থেকে ফোনে বলেছিলেন, "জান্তা শহরগুলিতে পিছু হটেছে। পুরো গ্রামাঞ্চল মুক্ত হয়েছে। শীঘ্রই প্রতিরোধবাহিনী  পপুলেশন সেন্টারগুলি দখল নিতে শুরু করবে।"
আজাদ নিজেকে একজন "বামপন্থী আন্তর্জাতিকতাবাদী" হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি উত্তর সিরিয়ায় কুর্দি-নেতৃত্বাধীন ওয়াইপিজি (পিপলস প্রোটেকশন ইউনিট) বাহিনীর সাথে চার বছর স্বেচ্ছাসেবক ছিলেন বলে জানিয়েছেন ।
২৪ বছর বয়সী এই যোদ্ধা বলেন, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি ক্যাফেতে কাজ করার সময় রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হন। তিনি সেনাবাহিনীতে কাজ করেননি। তিনি অনেকটা নতুন জেনারেল জেড কমরেডদের মতো, যারা মিয়ানমারের বিপ্লবকে শক্তি দিচ্ছেন।
তিনি বলেছিলেন যে তার বিদ্রোহী কমান্ডার তার চেয়ে মাত্র কয়েক বছরের বড় এবং সৈন্যদের অনেকেই আগে ছাত্র ছিল।
আজাদ উত্তর সিরিয়ার কুর্দি, আরব, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের স্বায়ত্তশাসনের লড়াই রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা ও  মিয়ানমারের বিপ্লবকে একটি বৈশ্বিক সংগ্রামের অংশ হিসেবে দেখেন।
মায়ানমার সরকার এবং মস্কোর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে আজাদ বলেন, বিশ্লেষকরা বলছেন যে অস্ত্রের দ্বিমুখী স্থানান্তর হচ্ছে। আসলে সবই এক সংগ্রাম।
তার মতে, আমাদের সমস্ত সংগ্রাম একই সুতোয় বাঁধা এটা বুঝতে পেরেই মিয়ানমারে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে তাদের প্রতি সংহতি বিনিময় করছি। 
তিনি তিন মাস ধরে চিন রাজ্যে রয়েছেন এবং মিয়ানমারে আরও আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবকদের আগমনের আশা করছেন। এরপর গ্রামীণ গেরিলা যুদ্ধ শহুরে অঞ্চলে স্থানান্তরিত হবে।
তিনি বলেন, "বিদ্রোহীরা যখন শক্তিশালী হয়, তখন দেশের ভেতরে ও বাইরের পথ ধীরে ধীরে সহজ হয়ে যায়। যুদ্ধের রসদ যত উন্নত হয় তখন স্বাভাবিকভাবে ধরে নেওয়া যায় আরও বেশি লোক যুদ্ধে যোগ দেবে।"
তিনি বলেছিলেন, যদিও মায়ানমারের বিপ্লব জান্তাকে সরিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিস্থাপনের পক্ষে নয়,  এটি একবিংশ শতাব্দীর নতুন জনগণের প্রতিরোধ।
তিনি বলেন,  "এই লোকদের সম্পর্কে এতটুকু শিখেছি যে তারা কয়েক বছরের ব্যবধানে, জান্তাকে পিছনে ঠেলে দিতে পারে, সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক"। এখানকার লোকেরা অবিশ্বাস্যভাবে সাহসী।
বিদেশী ব্যক্তিদের ছাড়াও , খ্রিস্টান মানবিক গোষ্ঠী, ফ্রি বার্মা রেঞ্জার্স (এফবিআর), ১৯৯০ সাল থেকে আন্তর্জাতিক এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকদের পূর্ব মায়ানমারের রাজ্যগুলোতে নিয়ে আসার জন্য সুপরিচিত। এই অঞ্চলে সংখ্যালঘুরা সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করছে।
এর স্বেচ্ছাসেবকরা বাস্তুচ্যুত সম্প্রদায়কে স্বাস্থ্যসেবা এবং সহায়তা প্রদান করে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা রেকর্ড করে। তারা যে বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করে তার পরিপ্রেক্ষিতে এর কিছু রেঞ্জার তাদের নিজস্ব সুরক্ষার জন্য এবং বাস্তুচ্যুতদের রক্ষা করার জন্য অস্ত্র বহন করে।
এফবিআর প্রতিষ্ঠাতা এবং সাবেক মার্কিন বিশেষ বাহিনীর সৈনিক ডেভিড ইউব্যাঙ্ক কারেন স্টেট থেকে একটি টেক্সট বার্তায় আল জাজিরাকে বলেছেন, "যারা চায় আমরা তাদের মানবিক প্রশিক্ষণ দিই - সামরিক প্রশিক্ষণ নয়। আমরা কোনো মিলিশিয়া বা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর অংশ নই। আমরা একটি ফ্রন্টলাইন রিলিফ গ্রুপ।"
এদিকে, জান্তার নিজস্ব ছোট কিন্তু শক্তিশালী বিদেশী সমর্থন ঘাঁটি রয়েছে। এপ্রিলে বলা হয়েছিল যে কর্মকর্তারা যুদ্ধ ড্রোন কিনতে রাশিয়া এবং চীন সফর করেছিলেন।
সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইং গত বছর ভ্লাদিভোস্টকে ভ্লাদিমির পুতিনের সাথে দেখা করেছিলেন। তখন রাশিয়ান কর্মকর্তারা তাকে বার্ষিক সশস্ত্র বাহিনী দিবসের কুচকাওয়াজে বিশিষ্ট অতিথি হিসেবে স্বাগত জানিয়েছেন। 
রাশিয়ার সামরিক প্রশিক্ষকরা মিয়ানমারে এসে জান্তার সৈন্যদের রাশিয়ার সরবরাহ করা অস্ত্রের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন বলে জানা গেছে। পূর্ব মিয়ানমারের প্রতিরোধ সূত্র বলছে, মাঝেমধ্যেই ফ্রন্ট লাইনের কাছে রাশিয়ানদের প্রশিক্ষণের খবর প্রচার করা হয়। যদিও আল জাজিরা বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিয়ানমারের একজন প্রতিরোধ কমান্ডার বলেছেন, চার মাস আগে দক্ষিণাঞ্চলীয় শান রাজ্যের একটি শহর পেকনে তার অপারেশন এলাকার কাছে একজন রাশিয়ান প্রশিক্ষক ছিল। তবে আমরা শুনেছি যে সেখানে সামরিক ক্যাম্পে হামলা তীব্রতর হওয়ায় তাকে বিমানে করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
-পার্বত্য সময়