১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর একটি যুদ্ধজাহাজ থেকে ছোড়া কয়েকটি গোলা বদলে দেয় বিশ্বের ইতিহাস। শুরু হয় মানবসভ্যতার ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ অধ্যায়-দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বরের ভোর। উত্তর জার্মানিতে তখন গ্রীষ্মের শেষ সময়। আবহাওয়া ছিল শান্ত, তাপমাত্রা প্রায় ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেই শান্ত পরিবেশ ভেঙে পড়ে গোলার শব্দে।
ডানজিগ বন্দরের কাছে পোলিশ সেনাদের ঘাঁটি ওয়েস্টারপ্লাটে আক্রমণ শুরু করে জার্মান বাহিনী। যুদ্ধজাহাজ ‘শ্লিসভিগ-হোলস্টাইন’ থেকে ছোড়া গোলাকেই সাধারণভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনাকারী গুলি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় এমন এক যুদ্ধ, যা পরবর্তী ছয় বছরে ইউরোপসহ বিশ্বের বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে।
বন্ধুত্বপূর্ণ সফরের আড়ালে ছিল যুদ্ধের প্রস্তুতি
যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে, ১৯৩৯ সালের ২৪ আগস্ট জার্মান যুদ্ধ ও প্রশিক্ষণ জাহাজ ‘শ্লিসভিগ-হোলস্টাইন’ পূর্ব সাগরের উপকূলীয় এলাকা উসেডম দ্বীপ থেকে যাত্রা শুরু করে।
সরকারি ভাষ্য ছিল, জাহাজটি ডানজিগের মুক্ত নগরীতে একটি বন্ধুত্বপূর্ণ সফরে যাচ্ছে। কিন্তু এর আড়ালে চলছিল ভিন্ন প্রস্তুতি।
২৪ থেকে ২৫ আগস্টের মধ্যবর্তী রাতে জাহাজটি গোপনে পূর্ব প্রুশিয়ার প্রায় ২২৫ জন নৌসেনাকে নিজেদের সঙ্গে নেয়। জাহাজটির অধিনায়ক গুস্তাভ ক্লাইকাম্পকে এর আগেই বার্লিনে ডেকে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা জানানো হয়েছিল।
২৫ আগস্ট সকালে ‘শ্লিসভিগ-হোলস্টাইন’ ডানজিগ বন্দরে পৌঁছালেও জাহাজে থাকা সেনাদের নামতে দেওয়া হয়নি। তাদের অপেক্ষা করতে বলা হয় নির্দিষ্ট নির্দেশের জন্য।
ডানজিগ ছিল অজুহাত
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান-অধ্যুষিত ডানজিগকে লিগ অব নেশনসের অধীনে একটি ‘মুক্ত নগররাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। শহরটি পোলিশ ভূখণ্ড দিয়ে ঘেরা ছিল।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতা হিটলারের নেতৃত্বাধীন নাৎসি সরকারের কাছে দীর্ঘদিনের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নাৎসি প্রচারণায় ডানজিগকে ‘জার্মান রাইখে ফিরিয়ে আনার’ দাবি জোরালো করা হয়।
তবে ইতিহাসের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডানজিগকে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি ছিল পোল্যান্ড আক্রমণের অন্যতম অজুহাত। হিটলারের মূল লক্ষ্য ছিল পূর্বদিকে জার্মান ভূখণ্ড ও প্রভাব বিস্তার করা।
১৯৩৯ সালের ২৩ মে ওবারজালৎসবের্গে সামরিক কর্মকর্তাদের সামনে দেওয়া বক্তব্যেও হিটলার পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সামরিক পরিকল্পনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে শুরু হয় আক্রমণ
১ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪৫ মিনিটে ওয়েস্টারপ্লাটে জার্মান আক্রমণ শুরু হয়। সেখানে প্রায় ২১৮ জন পোলিশ সেনা একটি সুরক্ষিত গোলাবারুদ গুদাম পাহারা দিচ্ছিলেন।
জার্মান যুদ্ধজাহাজ থেকে গোলাবর্ষণের পাশাপাশি স্থলপথেও হামলা চালানো হয়। সীমিতসংখ্যক পোলিশ সেনা কয়েক দিন ধরে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
ওয়েস্টারপ্লাটের এই লড়াই পরিণত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রথম দিকের অন্যতম প্রতীকী সংঘর্ষে।
হিটলারের ভাষণে যুদ্ধকে ‘আত্মরক্ষা’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা
পোল্যান্ডে আক্রমণের দিনই বার্লিনের রাইখস্টাগে ভাষণ দেন অ্যাডলফ হিটলার। জার্মান জনগণের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন।
হিটলার দাবি করেন, পোল্যান্ডই প্রথম জার্মান ভূখণ্ডে গুলি চালিয়েছে এবং জার্মানি কেবল পাল্টা জবাব দিচ্ছে।
বাস্তবে পোল্যান্ডে জার্মান আক্রমণ ছিল পূর্বপরিকল্পিত। যুদ্ধ শুরুর জন্য জনমতকে প্রস্তুত করতে নাৎসি প্রচারণাযন্ত্র নানা বিভ্রান্তিকর তথ্য ও সাজানো ঘটনার আশ্রয় নিয়েছিল।
ব্রিটেন ও ফ্রান্সের যুদ্ধ ঘোষণা
জার্মান বাহিনীর পোল্যান্ড আক্রমণের পর ব্রিটেন ও ফ্রান্স জার্মানিকে সেনা প্রত্যাহারের জন্য সময়সীমা বেঁধে দেয়। সেই দাবি পূরণ না হওয়ায় ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ দুই দেশ জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।
এর মধ্য দিয়ে ইউরোপের আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত বৃহত্তর আন্তর্জাতিক যুদ্ধে রূপ নিতে শুরু করে।
তবে এশিয়ায় যুদ্ধের সূত্রপাত হয়েছিল আরও আগে। ১৯৩৭ সালে জাপান চীনে বড় আকারের সামরিক অভিযান শুরু করলে পূর্ব এশিয়ায় সংঘাত ব্যাপক আকার ধারণ করে।
যুদ্ধের শুরুতে জার্মানদের মনোভাব কেমন ছিল?
যুদ্ধ শুরুর সময় জার্মান জনগণের প্রতিক্রিয়া ছিল একরকম নয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রত্যক্ষদর্শীর স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে উদ্বেগ, অস্বস্তি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা।
হামবুর্গের রাল্ফ ব্রাউয়ার, যিনি ১৯২৭ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে স্মরণ করেন—যুদ্ধের সম্ভাবনার কথা শুনে শৈশবে তিনি বরং উত্তেজিত হয়েছিলেন। তখনও যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিল না।
অন্যদিকে, রেডিও দোকানের কর্মচারী ভের্নার মর্ক স্মরণ করেছিলেন, হিটলারের ভাষণ শেষ হওয়ার পর অনেকের মধ্যে উচ্ছ্বাসের বদলে নেমে এসেছিল অস্বস্তিকর নীরবতা।
ছয় বছরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় বিশ্ব
১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫-ছয় বছর ধরে চলা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাকে রণক্ষেত্রে পরিণত করে।
স্থল, সমুদ্র ও আকাশে সংঘর্ষের পাশাপাশি গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, দুর্ভিক্ষ, রোগ এবং বাস্তুচ্যুতির কারণে কোটি কোটি মানুষ প্রাণ হারান। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধে প্রায় ৬ থেকে সাড়ে ৭ কোটি মানুষ নিহত হন।
সোভিয়েত ইউনিয়নে প্রাণ হারান প্রায় আড়াই কোটি মানুষ। চীনেও নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় দেড় কোটি। জার্মানি ও পোল্যান্ডেও লাখ লাখ মানুষ নিহত হন।
১৯৪৫ সালে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপের মধ্য দিয়ে যুদ্ধের ভয়াবহতা নতুন মাত্রা পায়। মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করা হয়।
কেন শুরু হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পেছনে একক কোনো কারণ ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির ওপর চাপিয়ে দেওয়া ভার্সাই চুক্তি, অর্থনৈতিক সংকট, জাতীয়তাবাদী ক্ষোভ, ভাইমার প্রজাতন্ত্রের দুর্বলতা এবং নাৎসিবাদের উত্থান—সবকিছু মিলে একটি বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
১৯৩৩ সালে ক্ষমতায় এসে অ্যাডলফ হিটলার জার্মানিকে দ্রুত একটি একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করেন। এরপর সামরিক শক্তি বৃদ্ধি, ভূখণ্ড সম্প্রসারণ এবং আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন তিনি।
তবে ইতিহাসবিদদের বড় অংশই মনে করেন, ভার্সাই চুক্তি একাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ ছিল না। বরং নাৎসিবাদের উত্থান ও হিটলারের পরিকল্পিত আগ্রাসী নীতি যুদ্ধ শুরুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বদলে যায় বিশ্বব্যবস্থা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্র আমূল বদলে যায়। ইউরোপের বহু পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামোর পতন ঘটে। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন দুই পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং শুরু হয় নতুন এক বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা-শীতল যুদ্ধ।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পরবর্তী কয়েক দশকে যে সংঘাত ও প্রক্সি যুদ্ধ দেখা যায়, তার পেছনেও এই দুই পরাশক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার বড় ভূমিকা ছিল।
প্রতিবছর ১ সেপ্টেম্বর জার্মানিতে ‘যুদ্ধবিরোধী দিবস’ হিসেবে দিনটি পালন করা হয়। দিনটি মনে করিয়ে দেয়-একটি যুদ্ধের শুরু কখনোই শুধু একটি দেশের ইতিহাস বদলায় না। তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, দেশ থেকে দেশে।
১৯৩৯ সালের সেই ভোরে ওয়েস্টারপ্লাটে যে গোলার শব্দ উঠেছিল, তার প্রতিধ্বনি ছয় বছর ধরে কাঁপিয়েছিল পুরো পৃথিবীকে।


