বিশ্বের প্রাকৃতিক বিস্ময়াবলীর অন্যতম সমুদ্র উপকূলবর্তী নোনা পরিবেশের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। প্রাণ ও প্রকৃতির এক লীলাভূমি এই বনে রয়েছে নানা প্রজাতির উদ্ভিদ, পাখি, উভচর, সরীসৃপ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী। বুধবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ১৮তম সুন্দরবন দিবস। সুন্দরবন দিবসের মূল অনুষ্ঠানটি হবে খুলনায়। দিবসটি উপলক্ষ্যে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ নুরুল কবির বলেন, ‘সুন্দরবনে যেমনি ভাঙন আছে, তেমনি সৃষ্টিও আছে। কিন্তু এ বনের আয়তন কমেছে, নাকি বেড়েছে তা নিয়ে জরীপ হয়নি। এ ধরনের কোন পদক্ষেপও নেই।

১৯৭৭ সালে সুন্দরবনকে বিশ্ব ঐতিহ্য ঘোষণা করে ইউনেস্কো। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন, অবৈধ বসতি স্থাপন ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে গাছ কাটার ফলে সুন্দরবনের আয়তন কমেছে। সুন্দরী গাছ কমেছে ২৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ।

সুন্দরবন ভ্রমণপ্রেমীরা বলেন, বিশ্ব সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবন। সুন্দরবনের প্রাণ ও প্রকৃতি দেখে আমরা আনন্দিত। সুন্দরবনের ভালোবাসায় প্রতি বছরই আমরা ছুটে আসি। এই বনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমাদেরকে টানে। এখানে অনেক ইকোটোরিজম রয়েছে সেখানে আমরা ঘুরেছি। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আমরা উপভোগ করছি। এই বনের গাছপালা, নদী, খাল, বন্যপ্রাণী ও স্থলপায়ী প্রাণী দেখেছি। হরিণ, শুকর, কুমির বানর, পাখিসহ নানা প্রজাতির প্রাণী আমরা দেখেছি। তবে বাঘের দেখা পাইনি। আগের মত সবপ্রাণী দেখা যায় না। তবুও সুন্দরবনের ভালোবাসার টানে আমাদের ছুটে আসা।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মূলত অক্টবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীত মৌসুমে সুন্দরবনে পর্যটকরা আসে। সেইসময়ের সুন্দরবনের নদী এবং খালগুলো যথেষ্ট ঠান্ডা থাকে এবং আবহাওয়া অনুকূল থাকে। গত ৫ অর্থ বছরের বেড়েছে সুন্দরবনে দেশি-বিদেশি পর্যটক। ২০২২-২০২৩ অর্থ বছরে সুন্দরবনে এসেছে ২ লাখ ১৬ হাজার ১৪৩ জন পর্যটক। যারমধ্যে দেশি পর্যটক ছিল ২ লাখ ১৪ হাজার এবং বিদেশি পর্যটক ২ হাজার ১৪৩ জন। এতে রাজস্ব আয় হয় ৩ কোটি ৯৪ লাখ ৩২ হাজার ৪৮০ টাকা।

ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের সেক্রেটারি এম. নাজমুল আযম ডেভিড বলেন, সুন্দরবনের সৌন্দর্যের টানে প্রতিবছরই পর্যটক বাড়ছে। তিনি বলেন, বেসরকারিভাবে পর্যটকদের ভ্রমণে  সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। তবে সুন্দরবনের পর্যটন বিকাশে সরকারিভাবে আরও সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো প্রয়োজন।

সুন্দরবনের ইতিবাচক দিক হচ্ছে সরকার বর্তমানে সুন্দরবন সুরক্ষার বিষয়ে অনেক সচেতন। আগে সুন্দরবন বা জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় তেমন কোনও পদক্ষেপ ছিল না। এখন ধারাবাহিকভাবে এ বিষয়ে সরকার বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করছে। বাঘ সুরক্ষায়ও কাজ করছে। আর নেতিবাচক আছে অনেক। আমরা চাইছিলাম বছরের একটি দিন যদি দেশব্যাপী জাতীয়ভাবে দিবস হিসেবে পালিত হয় তাতে সুন্দরবনের মর্যাদা আরও বেশি প্রতিফলিত হবে এবং বিষয়টিতে মানুষের সম্পৃক্ততাও বাড়বে। কিন্তু দিবসটির ব্যাপারে সরকার নির্লিপ্ত। গত ২২ বছরেও সরকার বিষয়টি আমলে নেয়নি। আর বন বিভাগও এ বিষয়ে অগ্রসর হয়নি। তারা মনে করে দিবস হলে কর্তৃত্ব বন বিভাগের বাইরে যেতে পারে। বিষ দিয়ে ধরার কারণে প্রচুর মৎস্যসম্পদ নষ্ট হচ্ছে। আর বিষের প্রভাবে জীববৈচিত্র্যও হুমকিতে পড়ছে। এ বিষয়ে সরকার এখনও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেনি। সার্বিকভাবে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ না করলে সুন্দরবনকে টিকিয়ে রাখা যাবে না। প্রাণ ও প্রকৃতির এক লীলাভূমি এই বনে রয়েছে পাঁচ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, ১৯৮ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১২৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৭৯ প্রজাতির পাখি, ১২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী।

 

-পার্বত্য সময়