দিনটি ছিল ২০১৬ সালের ১ জুলাই (শুক্রবার)। রাত পৌনে ৯টার দিকে খবর পাওয়া যায় রাজধানীর গুলশানের ৭৯ নম্বর সড়কের হলি আর্টিজান বেকারিতে ‘সন্ত্রাসীদের সঙ্গে’ পুলিশের গোলাগুলি হচ্ছে। নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি বেকারিতে ঢুকে প্রথমে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ১৮ জন বিদেশি নাগরিকসহ ২২ জনকে নির্মমভাবে হত্যা করে।
তাদের মধ্যে নয়জন ইতালির, সাতজন জাপানের, একজন ভারতীয় এবং তিনজন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। তিনজন বাংলাদেশির মধ্যে একজনের দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল। নারকীয় ওই হামলা প্রতিরোধ করতে গিয়ে প্রাণ হারান দুই পুলিশ কর্মকর্তা।
ওই দিন পুরো রাত স্পর্শকাতর বিবেচনায় কয়েকবার প্রস্তুতি নেয়া সত্ত্বেও অভিযান চালানো থেকে বিরত থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পরে কমান্ডো অভিযানে নিহত হয় পাঁচ জঙ্গি।
রাজধানীর গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর রোডে অবস্থিত হলি আর্টিজান বেকারিটি দেশি বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে খুবই জনপ্রিয় একটি স্থান ছিলো। স্বভাবতই সন্ধ্যার পর অবসর সময় কাটাতে কিংবা খোশগল্প করতে সেখানে কূটনীতিকদের ভিড় বাড়তো। ২০১৬ সালের ১ জুলাইয়ের সন্ধ্যাটিও ছিলো এমনই একটি সন্ধ্যা।
তবে, সেদিনের সন্ধ্যাটি পরবর্তীতে হয়ে উঠেছিলো বিভীষিকাময়। রাতে অস্ত্র হাতে হলি আর্টিজানে ঢুকে পড়েছিল ৫ জঙ্গি। রেঁস্তোরায় ঢুকেই তারা চালাতে থাকে নৃশংসতা। যে নৃশংসতার বলি হন বাংলাদেশিসহ ২০ বিদেশি নাগরিক। জিম্মি করে রাখা হয় সেখানে থাকা অন্যান্যদেরকেও।
খবর পেয়ে ছুঁটে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। শুরুতে ৯ টা ২০ মিনিটে প্রাথমিকভাবে হামলা প্রতিহত করতে গেলে জঙ্গিরা এলোপাতাড়ি গুলি ও গ্রেনেড ছোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর। এসময় রবিউল ইসলাম নামে এক পুলিশ সদস্য আহত হলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।
ঘটনার স্পর্শকাতরতা অনুধাবন করে রাতে আর কোন ধরনের হামলা চালাইনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। পরে রাত পেরোলে সকাল ৭ টা ২০ মিনিটে সেনাবাহিনীর ‘প্যারা কমান্ডো’ ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ নামে একটি অভিযান চালায়। এ অভিযানে নিহত হন হামলাকারী ৫ জঙ্গি সদস্য। অভিযানে নিহত জঙ্গিরা হলেন রোহান ইমতিয়াজ, সামিউল মোবাশ্বির, নিবরাস ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ও খায়রুল ইসলাম।
এদিকে হলি আর্টিজানে হামলার দায় স্বীকার করে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। সেই বিবৃতিতে অভিযানে নিহতদের নিজেদের ‘সৈনিক’ বলে দাবি করে তারা। তবে তাদের এই দাবিকে নাকচ করে দেয় সরকার। বাংলাদেশ সরকার দাবি করে, নিহতদের সবাই দেশীয় জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য।
হলি আর্টিজানের হামলার ঘটনায় গুলশান থানায় করা মামলাটির তদন্ত করে সিটিটিসি। তারা এ ঘটনায় ২১ জনের সম্পৃক্ততা পায়। এদের মধ্যে ৫ জন হামলাস্থলে ‘অপারেশন থান্ডারভোল্ট’ এ প্রাণ হারান। এছাড়া পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালালে আরও ৮ জন নিহত হন। অভিযুক্ত বাকি ৮ জনকে আসামি করে করে ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই একটি অভিযোগপত্র আদালতে দেয়া হয়। এরপর ২০১৯ সালে মামলার রায়ে, ৮ আসামির সাতজনকে মৃত্যুদন্ড এবং বাকি একজনকে বেকসুর খালাস দেন আদালত।
পরে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে ৭ জঙ্গির সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন হাইকোর্ট। তবে এই মামলায় হাইকোর্টের রায় এখনও প্রকাশ হয়নি। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ উভয়ই এ মামলা আপিলে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টের রায় প্রকাশের অপেক্ষায় আছে। রাষ্ট্রপক্ষ বলেছেন, রায় প্রকাশের পর সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে আপিল করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। অপরদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী বলেছেন, রায়ের অনুলিপি পেলে আসামিদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে আপিল করবে কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রতিবছর এ দিনটি এলে জঙ্গি দমনে বাংলাদেশের সাহসী পদক্ষেপের কথা উঠে আসে। তবে এতো সব পদক্ষেপের মধ্যেও জঙ্গিবাদ এবং উগ্রবাদ নিয়ে শতভাগ নিশ্চিত থাকা যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে ধর্মীয় উগ্রবাদী জঙ্গি সংগঠনগুলোর কার্যক্রম দৃশ্যমান না থাকলেও গোপনে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে অনলাইনে সদস্য রিক্রুট করছে, আনসার আল ইসলাম, জেএমবি, নব্য জেএমবি, জাময়াতুল আনসার হিন্দ এর মতো জঙ্গি সংগঠনগুলো।
বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনার একটি দেশ। দেশের স্বাধীনতার জন্য জাতির বীর সন্তানরা প্রাণ-পণ লড়াই করেছিলেন ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে। তাই দেশকে ধর্মীয় উগ্রবাদের থেকে দূরে রাখতে প্রয়োজন সচেতনতা। বঙ্গবন্ধুর অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলা গড়তে ধর্মীয় উগ্রবাদ তথা জঙ্গিবাদকে না বলতে হবে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে।
-পার্বত্য সময়

