বাংলাদেশি জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ সোমালি জলদস্যুদের হাতে জিম্মি হয় ১২ মার্চ। ২৬ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও মুক্তি মেলেনি জাহাজ ও এর নাবিকদের। সোমালিয়ার উপকূলে জাহাজের ভেতরেই বন্দি অবস্থায় রয়েছেন ২৩ নাবিক, যাদের সবাই বাংলাদেশি।
জিম্মি নাবিকদের মুক্ত করতে জলদস্যুদের সঙ্গে জাহাজ মালিকপক্ষের আলোচনা এগিয়েছে অনেকদূর। মুক্তিপণ নিয়ে সমঝোতাও চূড়ান্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এখন কোন প্রক্রিয়ায় টাকা দেওয়া হবে এবং নাবিকদের মুক্তি হবে কিভাবে-তা নিয়ে আলোচনা চলছে। সব বিষয়ে সমঝোতা হতে আরও কিছুদিন সময় লাগতে পারে। তাই ঈদের আগে জিম্মিদের ছাড়া পাওয়ার আর সম্ভাবনা নেই। তাই এবারের ঈদে জিম্মি নাবিক পরিবারগুলোতে ঈদের আনন্দ নেই।
কারও পক্ষেই আনন্দের সঙ্গে ঈদ করা সম্ভব নয় বলে জিম্মি নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। কারও পরিবারে ঈদের নতুন জামা-কাপড় কেনা হয়নি, কারও পরিবারে বয়স্ক সদস্যরা দুশ্চিন্তায় হয়ে পড়েছেন অসুস্থ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেন, আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। যারা হাইজ্যাক করেছে তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চলছে। নাবিকরা ভালো আছেন। তাদের খাবার-দাবারেরও কোনো অসুবিধা নেই, তারা কেবিনে আছেন। যেহেতু আলোচনা অনেক দূর এগিয়েছে, আমরা আশা করছি ঈদের পর সহসা তাদের মুক্ত করা সম্ভব হবে।
তিনি আরও বলেন, সেই জাহাজের আশপাশে বিদেশি জাহাজও প্রস্তুত আছে। আলোচনার পাশাপাশি হাইজ্যাকারদের ওপর নানামুখী চাপও রয়েছে। জাহাজে যারা চাকরি করেন ঈদের আগে-পরে হিসাব করে তাদের ছুটি হয় না। তারা যান ৬ মাস কিংবা ১ বছরের জন্য। এই জাহাজ যদি হাইজ্যাক নাও হতো তবুও তাদের ঈদের আগে জাহাজ ছেড়ে পরিবারের সঙ্গে মিলিত হওয়ার কথা ছিল না।
এমভি আব্দুল্লাহ জাহাজে অয়েলার হিসাবে কর্মরত আইনুল হক অভি। বন্দি ২৩ নাবিকের একজন তিনি। তার পরিবার থাকে চট্টগ্রাম নগরীর কাজীর দেউড়ি এলাকায়। অভি অবিবাহিত। তার ছোট ভাই মাঈনুল হক মুন্না শনিবার বলেন, ভাই জিম্মি অবস্থায়। সেখানে কেমন আছে তাও জানি না। প্রতি শুক্রবার জলদস্যুরা কথা বলতে দেয়, কিন্তু তাতেও স্বস্তি পাই না। কখন মুক্তি মিলবে, শেষ পর্যন্ত কী ঘটবে ভাগ্যে-এমন আশঙ্কায় দিন কাটছে আমাদের। এ অবস্থায় ঈদের আনন্দ নেই পরিবারে।
তিনি জানান, ছেলের চিন্তায় তার মা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। নানা শারীরিক সমস্যাও দেখা দিয়েছে।
এমভি আব্দুল্লাহর চিফ অফিসার আতিকুল্লাহ খানের পরিবারেও নেই ঈদের আনন্দ। তার ছোট ভাই আসিফ নূর বলেন, ভাইয়া ফোন করে সবার জন্য ঈদের জামা-কাপড় কিনতে বলেছেন। কিন্তু আমাদের তো মন মানে না। তার দুই মেয়ে বাবার ফেরার অপেক্ষায় আছে। দুশ্চিন্তার মধ্যে দিন কাটছে সবার।
মো. শামসুদ্দিন নামের অপর এক নাবিকের পরিবারের সদস্যরা জানান, তাদের ঈদের আনন্দও ম্লান। অন্যবারের মতো খুশি নেই। আছে হতাশা আর শঙ্কা। অয়েলার পদে কর্মরত শামসুদ্দিনের বাসা চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার কাফকোসংলগ্ন সেন্টার এলাকায়। তার তিন মেয়ে। বড় মেয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। মেজো মেয়ে ক্লাস ওয়ানে এবং ছোট মেয়ের বয়স ৩ বছর। তাদের এবার ঈদ কাটবে নিরানন্দে। তারা বলছেন, দস্যুদের কাছে জিম্মি অবস্থায় থাকা আর এমনিতে মুক্ত অবস্থায় থাকা এক জিনিস নয়। মুক্ত অবস্থায় জীবিকার তাগিদে লাখ লাখ মানুষ দেশের বাইরে আছেন। স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করতে পারেন না। সেটার সঙ্গে জিম্মি নাবিকদের অনুপস্থিতির বিষয় মেলানো ঠিক হবে না।
নাবিকদের পরিবারের সদস্যদের ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মো. আনাম চৌধুরী বলেন, মাসের পর মাস সমুদ্রে থাকতে হয় নাবিকদের। ওই সময় তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। পরিবারের বড় দুঃসময়েও অনেক সময় তারা কাছে থাকতে পারেন না। ঈদের সময়ও অনেককে জাহাজে থাকতে হয়। এটাই নাবিকদের জীবন। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে জিম্মি নাবিকরা সহসাই মুক্তি পাবেন বলে আমরা আশাবাদী।
-পার্বত্য সময়

