মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির মধ্যে লড়াইয়ের মুখে প্রাণে বাঁচতে রোহিঙ্গারা নিজেদের আদি নিবাস ছেড়ে রাজ্যের নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দুই দেশের সীমান্ত এলাকায় আসা কয়েক’শ রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দিতে বাংলাদেশকে অনুরোধ করেছে জাতিসংঘ। কিন্তু বাংলাদেশ স্পষ্ট করেই জানিয়েছে, নতুন করে কোনো রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়া সম্ভব নয়।
বুধবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সভায় এমন আলোচনা হয়েছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্রে জানা গেছে। পররাষ্ট্র সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্সের সভায় সীমান্তের ওপারে অপেক্ষমাণ রোহিঙ্গাদের বিষয়ে আলোচনা হয়। এ সময় জাতিসংঘ মানবিক কারণে তাদেরকে আশ্রয় দেয়ার অনুরোধ জানায় বাংলাদেশকে। কিন্তু তাদের অনুরোধ রাখা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়ে দেয়া হয় সভায়।
টাস্কফোর্সের সভায় বাংলাদেশে প্রবেশের জন্য দুই দেশের সীমান্তের ১৯টি পয়েন্টে অপেক্ষমাণ প্রায় ৯০০ রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার প্রসঙ্গটি আলোচনায় তুলেছিলেন জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) প্রতিনিধি সুম্বল রিজভী। তিনি মানবিক কারণে অপেক্ষমাণ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার অনুরোধ জানান।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। কাজেই নতুন করে আর রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার ব্যাপারে জাতিসংঘের উপদেশ দেয়ার প্রয়োজন নেই। আরেকটা বিষয় মনে রাখা দরকার, রাখাইনে গৃহযুদ্ধের দামামা যতদিন বাজবে, ততদিন রোহিঙ্গা ফেরানোর সুযোগ থাকবে না।
সম্প্রতি রোহিয়্গা বিষয়ে সম্প্রতি সরকারের অবস্থান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করেই উল্লেখ করেছেন। কারণ, এই মুহূর্তে আশ্রিত রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য নানাভাবে সংকট তৈরি করেছে। ফলে নতুন করে আরও রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার সুযোগ বাংলাদেশের নেই।
উল্লেখ্য, ২ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে সীমান্তের ওপারে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির লড়াই চলছে। ৫ ফেব্রুয়ারি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুমে সীমান্তের ওপার থেকে আসা মর্টার শেলের আঘাতে দুজন নিহত হন। নিহত দুজনের মধ্যে একজন বাংলাদেশি নারী, অন্যজন রোহিঙ্গা পুরুষ। দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে ইতিমধ্যে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যসহ দেশটির ৩৩০ জন বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। ১৫ ফেব্রুয়ারি সকালে তাদের মিয়ানমারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমারে সেনা অভিযানের মুখে রাখাইন রাজ্যে বাস্তুচ্যুত প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। বর্তমানে উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয় শিবিরে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ। গত ছয় বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি।
সাবেক পররাষ্ট্রসচিব মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশ বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে। কাজেই নতুন করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে জাতিসংঘের মানবিক উপদেশ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আরেকটা বিষয় মনে রাখতে হবে যে রাখাইনে গৃহযুদ্ধের দামামা যত দিন বাজবে, ততদিন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সুযোগ থাকবে না। কাজেই ভবিষ্যতে কারা রাখাইনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে মূল নিয়ামক হয়ে উঠবে, সেই পক্ষগুলোর সঙ্গে এখন থেকে অন্তত অনানুষ্ঠানিকভাবে যুক্ততার জন্য বাংলাদেশের প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি হয়ে উঠেছে।
-পার্বত্য সময়

