পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক দলগুলি প্রায় সম্ভাব্য সব ক্ষেত্র থেকেই বিভিন্ন হারে চাঁদাবাজি করে থাকে। চাকুরীজীবী (পাহাড়ী/বাঙালী) ব্যক্তিরা জেলা ও দল ভেদে বিভিন্ন হারে বাৎসরিক চাঁদা দিয়ে থাকে। এছাড়া পাহাড়ী প্রতিটি পরিবার আঞ্চলিক দলের প্রভাব অনুযায়ী বিভিন্ন হারে বাৎসরিক চাঁদা দিয়ে থাকে।
জানা যায়, যানবাহন, দোকান, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, হোটেল ইত্যাদি হতেও বাৎসরিক হারে আঞ্চলিক দলগুলোকে চাঁদা দিতে হয়। কৃষিজাত পণ্য, মাছ, চাষাবাদ ইত্যাদি উৎপাদন ও বাজারজাত করার সময় চাঁদা দিয়ে থাকে। অপহরণের ক্ষেত্রে বড় মুক্তিপণও এসব সংগঠনের আয়ের উৎস্য। অনেক ক্ষেত্রেই অপহরনের তথ্য সংবাদ মাধ্যমে এবং আইন শৃংখলা বাহিনীর নিকট আসে না।
চাঁদাবাজির খাতগুলি সাধারণত ব্যবসায়িক, কৃষি, যানবাহন, ঠিকাদারী, কাঠ ও বাঁশ এবং অপহরণ। রাঙ্গামাটি জেলা আয়তন ও জনসংখ্যায় অন্যান্য পার্বত্য জেলা হতে বড় এবং ব্যবসা বাণিজ্য ও অন্যান্য ক্ষেত্রে এগিয়ে। এছাড়া পার্বত্য এলাকায় অধিকাংশ সরকারী অফিস ও কার্যক্রমের মূল কেন্দ্র বলে রাঙ্গামাটিতে আঞ্চলিক দলের চাঁদাবাজির হার বেশী। খাগড়াছড়িতে জনসংখ্যা ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড বিচারে এবং ৪টি দলেরই প্রভাব থাকায় সামগ্রিকভাবে রাঙ্গামাটির চেয়ে চাঁদাবাজির পরিমাণ কম নয়। বান্দরবান জেলার আয়তন, জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ও ভৌগলিকভাবে দুর্গম হওয়ায় অন্যান্য জেলার তুলনায় চাঁদাবাজি অনেক কম। তাছাড়া ঐতিহাসিকভাবে আঞ্চলিক দলগুলি বান্দরবানে প্রভাব বিস্তার করতে না পারায় চাঁদাবাজি কম হয়।
বেসরকারি ওই সংস্থার তথ্যমতে, ২০২৩ সালে রাঙ্গামাটি জেলায় চাঁদাবাজির পরিমান ২৪৪.৭০ কোটি, খাগড়াছড়ি জেলায় ৮৬.২২ কোটি এবং বান্দরবান জেলায় ২০.২১ কোটি । সাধারণ খাতে ৭৫.৩৪ কোটি, বিভিন্ন বাণিজ্যিক খাতে ১৮.৪৯ কোটি, কৃষি খাতে ৪৩.৬৩ কোটি, যানবাহন খাতে ১২.২৮ কোটি, উন্নয়ন কার্যক্রমে ঠিকাদারি ১২৩.৬১ কোটি, কাঠ ও বাঁশ খাতে ৭৩.২৮ কোটি এবং অপহরণ খাতে ৪.৪৬ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। সর্বোচ্চ ৩৫% চাঁদাবাজি উন্নয়ন কার্যক্রমে/ঠিকাদারী খাতে, যার পুরোটায় ঠিকাদাররা জেলা ও দল ভেদে প্রকল্প বাজেটের ২% হতে ১০% পর্যন্ত আঞ্চলিক দলকে দিয়ে থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর এক কালেক্টর (চাঁদা সংগ্রহকারী) জানান, একজন চাকুরিজীবী বছরে জেএসএস (সন্তু)-কে দেড় থেকে দুই হাজার, ইউপিডিএফ (প্রসীত)-কে ১ থেকে ২ হাজার, জেএসএস (সংস্কার)-কে ৫০০ থেকে ১ হাজার এবং আমাদের (ইইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক)-কে ১ হাজার করে চাঁদা দেয়। এছাড়াও গরু-ছাগল বিক্রির ক্ষেত্রে দেখা যায়, জেএসএস (সন্তু) ও ইউপিডিএফ (প্রসীত) পায় ৫'শ এবং আমরা (ইইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) ও জেএসএস (সংস্কার) পাই ৩'শ করে। এভাবে প্রতিটি খাতেই নির্ধারণ করা আছে।
সাধারণ মানুষ কেন তাদের চাঁদা দেয় জানতে চাইলে ওই কালেক্টরের সাফ উত্তর, নিরাপত্তার খাতিরেই দলগুলোকে চাঁদা দিতে বাধ্য হয়। নির্ধারিত চাঁদা প্রদান না করলেই অপহরণ করে আতংক সৃষ্টি করা হয়।
পার্বত্য অঞ্চলে দীর্ঘ সময় কাজ করা প্রাক্তন এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনে করেন, পাহাড়ীরা পূর্বে (শান্তিচুক্তির পূর্বে) স্বপ্রণোদিত হয়েই চাঁদা প্রদান করতো। বামপন্থী মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত এসব সংগঠনগুলো তাদের বিশ্বাস করাতে সক্ষম হয়েছিল যে, রাষ্ট্র তাদের অধিকার বঞ্চিত করে রেখেছে। কিন্তু বর্তমানে তার জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করছে। অধিকার আদায়ের কথা বলে আদতে পাহাড়ীদের বোকা বানাচ্ছে।
তিনি মনে করেন, 'অধিকার' শব্দটি এখানে উপলক্ষ্য মাত্র। চাঁদাবাজির জন্য অধিকার আদায়কে হাতিয়ার করা হয়েছে। সংগঠনগুলোর মূল উদ্দেশ্য স্থানীয়দের মাঝে আতংক সৃষ্টি করে আধিপত্য বিস্তার করা। আধিপত্যের ওপরই নির্ভর করে চাঁদার পরিমাণ।
ঠিকাদারী খাতে জেলা ভেদে আঞ্চলিক দলের আধিপত্য অনুযায়ী প্রতিটি উন্নয়ন প্রকল্পের বাজেট থেকে নির্ধারিত হারে চাঁদা প্রদান করলেই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। উন্নয়ন প্রকল্প ব্যয়ে রাঙ্গামাটি জেলায় ৫- ১০%, খাগড়াছড়ি জেলায় ২-৬% এবং বান্দরবান জেলায় ১-৩% অর্থ চাঁদা হিসাবে প্রদান করতে হয়। সাধারণত ঠিকাদার নিজে বা প্রতিনিধির মাধ্যমে চাঁদা চীফ কালেক্টরদের নিকট পৌঁছে দেয়। চাঁদা প্রদান না করলে আঞ্চলিক দল ভয়ভীতি, আক্রমণ বা অপহরণের মাধ্যমে কাজ বন্ধ করে দেয়।
শান্তিচুক্তির পর পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। ফলে এ খাত হতে সর্বোচ্চ পরিমাণ চাঁদা ১২৩ কোটি বা ৩৫% আঞ্চলিক দল সমূহ সংগ্রহ করে। এছাড়া কাঠ ব্যবসায়ীরা চাঁদাবাজির বড় অংশ ৭৩ কোটি টাকা বা ২১% সকল দলকে প্রদান করে। ঠিকাদার এবং কাঠ ব্যবসায়ীগণ বড় অংকের অর্থ সরাসরি আঞ্চলিক দলের চীফ কালেক্টরদের নিকট প্রদান করে থাকে।
এক সাথে বড় অংকের হওয়ায় এই খাত দুইটির অর্থ দিয়েই অস্ত্র গোলাবারুদ ক্রয়, বড় সাংগঠনিক কার্যক্রম, নেতৃবৃন্দের অবেধ সম্পদ অর্জন এবং দেশীয় ও আন্তর্জাতিক লবিং এ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া সাধারণত ঠিকাদারী এবং কাঠ-বাঁশ বাদে অন্যান্য খাত হতে সংগৃহীত চাঁদা আঞ্চলিক দলের কর্মীদের বেতনসহ প্রান্তিক পর্যায়ে সাধারণ খরচে বহন করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এক কর্মকর্তা জানান, উন্নয়ন বাজেটে ঠিকাদারী এবং কাঠ-বাঁশ খাত বাদে অন্যান্য খাত সমূহ হতে চাঁদা প্রান্তিক পর্যায়ে সংগ্রহ করা হয়। ফলে চাঁদা প্রদানের ব্যক্তি ও সংগ্রহকারীদের সংখ্যা অনেক। এ কারণে ঠিকাদার ও কাঠ-বাঁশ বাদে অন্যান্য খাতে চাঁদাবাজী বন্ধ বা সীমিত করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। বিভিন্ন সময় চাঁদাবাজদের আটক করা হলেও আইনী দূর্বলতার কারণে তাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক আটক করতে বাঁধাগ্রস্থ হয়।
আঞ্চলিক দলগুলির মধ্যে প্রভাব ও আধিপত্য বেশী থাকায় জেএসএস (সন্তু) নূন্যতম ১২৫ কোটি টাকা এবং ইউপিডিএফ (প্রসীত) নূন্যতম ১০৪ কোটি টাকা চাঁদা সংগ্রহ করে। সমভাবপন্ন দল জেএসএস (সংস্কার) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) এর প্রভাব ও আধিপত্য সীমিত হলেও স্থানীয় প্রশাসনের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি করে থাকে। এমএনপি এবং কেএনএফ এর চাঁদাবাজি সীমিত। এনএমপি ৭১ লক্ষ যা শুধুমাত্র রাঙ্গামাটি জেলা থেকে এবং একমাত্র বান্দরবান জেলা থেকে ৯৪ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করার হিসাব পাওয়া যায়।
এ ছাড়া হিসাবের বাইরেও আরও অনেক টাকা এই দলগুলো সংগ্রহ করে। এই বিপুল অর্থের ভাটোয়ারাই এই দলগুলোর মধ্যে কোন্দলের সৃষ্টি করে এবং নতুন দলের সৃষ্টি হয়।
অরবিন্দ বাগচী
-পার্বত্য সময়

